|| ইতিহাসে পাতিহাঁস… ||
পনেরোই অগাস্ট, স্বাধীনতা দিবস ... স্বভাবত ইতিহাসের দিকে মন টানে! যাদের কিছু নরেন্দ্রপুরের/রামকৃষ্ণ মিশনের বন্ধু আছে, তারা জানেনই যে মিশনের ছেলেরা গরুর রচনার খুব ভক্ত ... যা কিছু নিয়েই কথা হোক না কেন, ঝোল সেই মিশনেই গড়াবে! আমাদের স্কুলে ইতিহাসের কিছু শিক্ষিকের কথা মনে পড়ে যায়, যথা - ব্যোমকেশদা এবং পরিতোষদা|
ব্যোমকেশদা বোধহয় ইতিহাস বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন একসময়ে - চোখে হাই পাওয়ারের চশমা, পরনে ভাঁজ ভাঙা শার্ট-প্যান্ট আর ধীর স্থির বিচরণ গতি | ব্যোমকেশদার চোখের চশমার কাঁচ এতো পুরু ছিল যে, ফ্রেম থেকে অধিকাংশই বেরিয়ে থাকতো ... চোখগুলি দেখাতো মার্বেলের গুলির মতো! চশমা পরেও বিশেষ দেখতে পারতেন না কিন্তু ইতিহাসের জ্ঞান ছিল অগাধ |
এহেন ব্যোমকেশদা একবার ক্লাস এইট এ পড়াতে গিয়ে প্রাচীন অবিভক্ত ভারতের মানচিত্র এঁকেছিলেন ব্ল্যাকবোর্ডে | একটি মানুষ যিনি চোখে দেখতে পান না, তাঁর পক্ষে আঁকাটা সহজসাধ্য নয় কিন্তু আমাদের পেছন-পাকা মনিটর দিলো সেটা মুছে ক্লাসের শেষে! পরের দিনে, স্যার এসে ফাঁকা বোর্ডের ওপরে তর্জনী স্থাপন করে জিজ্ঞেস করলেন, “এই অঞ্চলটাকে কি বলে?” সকলে চুপ, বলতেও পারছিনা বোর্ডে কিছুই নেই! নিজেদের মধ্যে তামাশা করে নিচু গলায় কেউ বললো, ‘ব্ল্যাক ফরেস্ট’... কেউ বললো, “ভট্টার আঁকা” (ভট্টা আমাদের মহান শিল্পী, কালো নদীতে কালো নৌকোর রোদে পোড়া কৃষবর্ণ মাঝির মাছ ধরা এঁকেছিল!)| প্রকাশ্যে কোনো উত্তর না আসায়, স্যার বললেন, “এটা পেনিনসুলার ইন্ডিয়া বা দ্রাভিদিয়ান ইন্ডিয়া!” এর পর, আমাদের জ্ঞানা (তখন গুগল না থাকলেও আমাদের সর্ববিষয়ক অভাব পূরণ করতো, সহপাঠী - শ্রীল শ্রীযুক্ত জ্ঞানরত্ন জ্ঞানেন্দ্রিয় জ্ঞানতীর্থ জ্ঞানাম্বুধি শ্রীজ্ঞান জ্ঞানা) মনে হয় নিদ্রাদেবীর আরাধনায় বাহ্যজ্ঞানহীন হয়ে পড়লো! এদিকে আমাদের মতো অপোগন্ডদের নিয়ে ব্যোমকেশদা টেক্সটবই রিডিং পড়াচ্ছেন আর মৃদু গলায় প্রশ্ন শুধোচ্ছেন, চুপ করে থাকলে, নিজেই উত্তরগুলো দিয়ে দিচ্ছেন | কিছু লোকে ফিসফিস করে গল্প করছে, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে কাগজের প্লেন বানাচ্ছি আর বিজ্ঞান-সম্মত ভাবে কিংবা নিজের প্রগাঢ় এয়ারোরোডিনামিক অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করে ডানায় ভাঁজ দিচ্ছি! আমার বাবা এয়ার ইন্ডিয়াতে কাজ করতেন আর সেই সুবাদে, আমি প্ৰায়ে প্রতি বছরই আমেরিকা দর্শনে নিউইয়র্কের জেঠার বাড়ি যেতাম | আমাকে ‘চোদ্দবার আমেরিকা’ বলে লোকে ক্ষ্যাপাত আর আমি আমার আন্তর্জাতিক প্রজ্ঞা (কিছু জ্ঞান আর কিছু গুল) দিয়ে তাদের ঠেকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করতাম | আমারদের সৌমিত্তিরের ছিল মামা ঘ্যাম, ওর জাপানি মামা পারেন না এমন কিছু ছিল না বিশ্ব সংসারে! আমেরিকা-জাপান সংঘাত ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসে আমাদের মধ্যে বিদ্যমান | সৌমিত্তিরের মধ্যে আমি - সাম্যতা বা মিত্রতা, দুটির একটিও অনুধাবন করতে পারিনি, তাই ওর মুন্ডি তাগ করে রকেট ছুড়ছিলাম | জাপানি মামার শেখানো উশুর প্যাঁচ এতো দূরে কার্যকরী নয় বলেই হয়তো সে একটা পাতি রকেট ছুঁড়লো আমার দিকে | পড়াশোনায় আমি বিকট পন্ডিত, তাই সেকেনবেঞ্চিতে বসতাম | ফাসবেঞ্চির ভালো ছেলেরা প্রশ্নের বান ঠেকাতো আর লাসবেঞ্চির বকাটে ছোকরারা পেঁদানির | জাপানি বোনপো পড়ুয়া হিসেবে ভালোই ছিল কিন্তু সেদিন পেছনে রোদে বসে তেল মালিশ করছিলো নিজের পায়ে, বোধহয় ফুটবল খেলতে গিয়ে লেগে গেছিলো! তা সেই তেলো হাতে রকেট ফস্কে গিয়ে সোজা ব্যোমকেশদার চটিতে ঠোক্কর লাগালো! ব্যোমকেশদা চিৎকার করে উঠলেন, "ইন্ডিয়ান ফিলোসফির সামারিটা কি? গতকালই তোমাদের বলেছিলাম!" হঠাৎ চিৎকারে জ্ঞানা ঘুম থেকে উঠে থাড়িমাড়ি বলে দিলো, "সিম্পল লিভিং এন্ড হাই থিংকিং"! উত্তেজিত ব্যোমকেশদা বললেন, "এইতো একজনই দেখছি ক্লাসে মন দিয়ে কথা শোনে!"
পরিতোষদা আমাদের ইতিহাসের প্রতি ঐতিহাসিক ভ্রিতির সঞ্চারক ছিলেন | শুনেছি ওনারা শুঁড়ির দিকের সম্পন্ন ঘরের মানুষ, বাবা ছিলেন দারোগা... কালীপূজোতে পাড়ার লোক খাওয়াতেন | বোধহয় ওনার পৈতৃক রুলের গুঁতো, আমাদের কাছে চালান করতেন পরীক্ষার খাতা মাফেরোতে! মাসিক পরীক্ষায়, চল্লিশে ষোলোতে পাস - ক্লাস সেভেনে মিনুদাসা (মৈনাক), পনেরো পেয়ে আধ নম্বরের জন্যে কেঁদেকেটে একশা! তাও পরিতোষদা অবিচল চিত্তে প্রস্তাব খারিজ করে বললেন, “এই কারা কারা কুড়ির ওপরে পেয়েছিস উঠে দাঁড়া!” আমাদের জগা (জয়দীপ) আর চারজন বুক ফুলিয়ে দাঁড়ালো | পারিতোষদা ওদের দেখিয়ে বললেন "দ্যাখ, এইযে পাঁচটা ছেলে এতো নম্বর পেয়েছে, এগুলো কি এদের মুখ দেখে দিয়েছি?" সেদিনই বোধোদয় হলো যে আমার মতো ছেলের পরিতোষদার ক্লাসে পাস করা অসম্ভব... পিঠ বাঁচাতে পারলেই মঙ্গল!
এহেন পরিতোষদার প্যান্টে চকের ফুটকির জন্যে দায়ী ছিল কুমড়ি! সেকেন্ড হাফের প্রথম ক্লাস, হোস্টেল থেকে খেয়ে দেয়ে শীতের দুকুরের পোস্তর আমেজে মত্ত আমরা, গুলতানি করছি ... ঘন্টা পড়লে পরিতোষদা এসে সিপাহী বিদ্রোহীসহ আমাদের ঘুম পড়াবেন! ক্লাস এর পেছনে বিস্ওয়া (বিশু) আর মাঝে কুমড়ি (কুমার) চক ছোঁড়াছুঁড়ি করছে একে অপরের মাথা টিপ্ করে | আমি সেকেনবেঞ্চিতে ঘাপটি মেরে ওদের দুটোকে চক মারছি সুযোগ বুঝে | হটাৎ কুমড়ি বুঝতে পেরে আমার দিকে প্রবল পরাক্রমে চকের নিচের দিকের মোটা অংশগুলো মারতে লাগলো! এমন সময় পরিতোষদা হনহন করে ক্লাসে ঢুকে ডায়াস এর ওপরে উঠে দাঁড়ালেন | ঠিক সেই মুহূর্তেই কুমড়ির ছোঁড়া একটা বড়ো সাইজের চক আমার মাথা মিস করে... সম্ভবতঃ, পরিতোষদার অপাঙ্গে লংকাকান্ড বাঁধিয়ে দিলো! তারপর কুমড়ির তুলোধোনা তো বলাই বাহুল্য - পুরো কুমড়োর ছক্কা!
ক্লাস টেনে পরিতোষদা আমাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে গিয়ে সিলেবাস শেষ করে উঠতে পারেননি তখনো | জ্ঞানের প্রসার হোক বা না হোক, মাসিক পরীক্ষার আগের দিন ধীশক্তিমান ভালোছেলেরা চেপে ধরলো বই শেষ করতেই হবে! ফাসবেঞ্চির ল্যাদ (ঘোষাল) ভীষণ মনঃসংযোগ নিয়ে পরিতোষদার মুখের দিকে তাকিয়ে শুনছে | পরিতোষদা ক্লাসের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত হনহন করে হাঁটছেন আর গড়গড় করে মধুসূদনের মতো আবৃত্তি করে যাচ্ছেন! হঠাৎ, ল্যাদকে ঠাসিয়ে এক চড় বসালেন! ঘোষাল হকচকিয়ে, পেনটেন ফেলে অবাক হয়ে শুধোল, “কি হলো?” পরিতোষদার তখন সিলেবাস শেষের দুরন্ত রেল ছুটছে, বললেন, "ছেলে, এখন চড়টা খা, ... মান্থলীর পর বলবো কেন ... এখন টাইম নেই!" ক্রমশ প্রকাশ্য, ল্যাদের বাড়ানো পায়ে পরিতোষদা হোঁচট খেয়ে ইতিহাসকে তাৎক্ষণিকভাবে লাইনচ্যুত করেছিলেন!
- চিরন্তন
P.S. রোমন্থনে Jaydeep, Rajib, Biswajit & Arnab
কিছু সত্য, কিছু কল্পনা নিয়ে এই বিগত দিনের সিরিজ, এটাকে ঐতিহাসিক সত্য ভাববেন না, গল্প হিসেবে গ্রহণ করবেন 🙏🏼