|| ভূগোলেতে গোল...||
আমি চিরকালই লেখাপড়ায় কাঁচা, ভূগোল মানেই যে জিওগ্রাফি তাই জানতাম না; যখন প্রথম নরেন্দ্রপুরে পড়তে এলাম ক্লাস ফাইভে | একে আগে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়তাম, তদুপরি জেনারেল সাইন্স নামক বইটা দেখলেই বড়ো ঘুম পেতো ক্লাস ফোরে ... স্বভাবত, গোল লেগে গ্যালো!
আমাদের ভূগোল পড়াতেন প্রবোদদা, গিলে করা পাঞ্জাবি এর আগে দেখিনি, তাই ভাবতাম, স্যার কি হাতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন? তাই হাতাগুলো কুঁচকে যায়? ধপধপে সাদা ধুতি আর গিলে করা পাঞ্জাবি পরা প্রবোধ মন্ডলদা যখন কোঁকড়ানো চুলভর্তি মাথা নাড়িয়ে কিছু একটা প্রশ্ন করতেন, তখন আমার ভীতু পিলে কোনো বাঁধই মানতো না! পরবর্তী জীবনে, সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়কে বলতে শুনেছি, “জীবনে টান থাকা দরকার...” - সেই টানটা উপলব্ধি করলাম প্রথম প্রবোধদার ক্লাসে! কানে টান খেয়ে একমাত্র যে ঘুম থেকে উঠেছে, সেই জানে, একি টনটনে টান ... ক্যাঁক করে টানের চোটে, কানে দূরদর্শন শুরুর আগের কোঁ কোঁ শুরু হয়ে যেত! হাতের লেখার ক্লাসে বাংলা স্যার, আমাদের ব্যান্ডেলের হিরোকে বলতেন, “সুষেণ, খাতা দেখান কি করেছেন? এবার ক্লাসের বাইরে বেরিয়ে যাবেন!” শুভ্রই লাকি ছিল এবং রবিনদার দেবতুল্য রসজ্ঞান ... বেরিয়ে গিয়েই রেহাই পেতো! আমার কপাল পোড়া, প্রবোধদা আমাকে ভূগোলে ভুগিয়েই ছাড়তেন! ওনার বিখ্যাত বিরাশি সিক্কার চড় আমার বদনের জিওগ্রাফি বদলে ছাড়তো, তারপর কি মুক্তি! তিনতলার ক্লাসের বাইরে ছিল টানা বারান্দা, নিলডাউন হয়েও দেখা যেতো নীল আকাশ, টিয়ার ঝাঁক, দূরে ছোটদের লাইব্রেরী বিল্ডিঙের পাশে কালচে সবুজ পুকুর... আস্তে করে রেলিঙের ধারে এসে ঝুঁকি মারলে দেখা যেত ইস্কুলের বিশাল লন, চারি দিকে টব দিয়ে ঘেৱা। সব থেকে মায়াবী লাগতো লাল টবগুলোর পরে, হলুদ ইঁট-সিমেন্টের রেলিং পেরিয়ে, কালো পিচের রাস্তাটা ...ওটাই ছিল আমাদের কিশোর মনের সীমানা, তার বাইরে বেরোনোর জন্যে মন আঁকু পাঁকু করতো! লাল কানের টন টনে ব্যথা ভুলে তাকিয়ে থাকতাম কবে রোববার আসবে আর এই কালো রাস্তা ফোটাবে মনে রং ... এই পথেই আসবে মা, বাবার হাত ধরে আমার ছোট্ট বোন! কোথা থেকে একটা চিল এসে চক্রাকারে ইস্কুলটাকে চক্কর মারতো আর আমাদের গলা দিয়ে না বেরোনো অব্যক্ত আর্তনাদ, চিঁ চিঁ করে সবাইকে জানাতো ... ফেলে পালিয়ে যেতো না সবুজ গ্রিলের পেছনে! তখন আম আঁটির ভেঁপু পড়েছি, কল্পনা করতাম অপুর মতো ট্রেনের পেছনে ছুটছি! মনটা হু হু করে উঠতো অভিমানে, কার প্রতি ঠিক মনে পড়ে না ... ক্লাসের শিক্ষকের প্রতি? যিনি কোনোদিন বুঝলেনই না কেন পড়া পারি না; নাকি, আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্বার্থত্যাগী বাবা-মা, যারা এই আবাসিক কারাগারে ফেলে গেছেন?
কিন্তু সে বেশিক্ষণের জন্যে নয়, তাকিয়ে দেখি প্রবোধদা ক্লাসের দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আর পেছনে জ্ঞ্যানা, দাঁত ক্যালাচ্ছে! দ্বিতীয় প্রস্থ চাঁটি খেতে খেতে উপলব্ধি হলো কোন ভালো ছেলে লাগিয়েছে স্যারের কাছে, সব রাগ জমা হলো খুনসুটে সহপাঠীর ওপরে! আমি পড়া পারি, না পারি, নিলডাউন থেকে উঠে দাঁড়াই কিনা - ওর তাতে কি? অতএব তক্কেতক্কে থাকলুম, দুপুর বেলা খেয়ে, সেকেন্ড হাফ ইস্কুল আসার সময়ে পকেট ভর্তি ঢিল আনলাম। বিকেলে ছুটির সময়ে সবাই ছুটে নিচে পালালো, পড়ি মরি করে ভবনে পোঁছে, কাপড় ছেড়ে খেলার মাঠে পৌঁছনোর আগ্রহে। আমি তেতলার বাথরুমে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায়, যেই আমার মার্কামারা টিচার্স পেট বন্ধুটি খোলা জায়গায় বেরিয়েছে, ব্যাস দেগে দিলাম মিসাইলগুলো! কটা কার মাথায় লাগলো দেখার অবকাশ নেই, ছুট্টে তেতলা থেকে একতলায় নেমে, সোজা প্রোক্টরের ঘরের সামনে নিলডাউন! আড়চোখে দেখলাম বেশ চেঁচামেঁচি, একজন তরুণ শিক্ষক এবং কয়েকজন সিনিয়র ধেয়ে গ্যালো সিঁড়ি বেয়ে ওপরে। বেশ কিছুক্ষন খোঁজা খুঁজির পর আমাকেই জিজ্ঞেস করলো কাউকে পালাতে দেখেছি কিনা? আমি তো লজ্জিত নতমুখে নিলডাউন ফেকলু ছেলে, কেউ পাত্তাই দিলো না! ময়দান ফাঁকা হতে, একা মিচকি মিচকি হাসতে হাসতে ভবনে ফিরলুম!
পরের ঘটনা কিছু বছর পরে, জুনিয়র সেকশন থেকে সিনিয়র সেকশানে পড়ি, সুভাষদা তখন আমাদের ভূগোল পড়ান, মনে হয় সেভেনে পড়ি। চল্লিশে মাসিক পরীক্ষা হতো, ষোলতে পাস... যারা তিরিশের ওপরে পেতো, তারা গোল্ডেন বয়েজ।পরীক্ষার খাতা ফেরৎ দেবার সময়ে সুভাষদার রসবোধ প্রকাশ পেলো একবার, “চিরন্তন ঘোষ... ২১!” আমিতো অবাক, পাস করেছি? শুধু পাস নয় ফিফটি পার্সেন্ট মার্কস, অভাবনীয়! লাস্ট বেঞ্চ থেকে টিচার্স ডায়াস, ঐটুকু পৌঁছনোর মধ্যে য কত স্বপ্ন দেখে ফেললুম, রবিবার ঠেঙানীর আগেই মাকে এই খাতা দেখাবো! ও বাবাঃ, হাতে নিয়ে দেখি, পুনর্মূষিকো ভবঃ! পেয়েছি প্রত্যাশিত নম্বর ১২, এখন হয় কেঁদে কেটে সাড়ে পনেরো করা, না হলে আবার লাল কালি আর ঠেঙানি। ভেবেছিলুম সহপাঠিদের হাস্যাস্পদ হওয়ার থেকে বেঁচে যাবো, কিন্তু কপালে যদি না থাকে গুড় তুমি খাও ঘোড়ার ক্ষুর! সবে খাতা হাতে পেছন ফিরেছি, অমনি আরেক সহপাঠীর নাম ও ফল ঘোষনা করলেন সুভাষদা... এবারো নম্বর উল্টে! আমার এই সহধর্মী বন্ধুটি, ০৫ এর গন্ডিটি মেনে চলতেন ... ব্যস, গোল্ডেন বয়রা বুঝে ফেললো সুভাষদার ছোট্ট ছলনা! পড়ে গেলো হাসির ধুম, সবাই আমার খাতা দেখতে চায়! বুঝলাম না, এই নিষ্ঠুর পরিহাসটা কার, স্যারের না ভাগ্যের! মুখ লুকিয়ে পিরিয়ডটা কাটিয়ে দিলাম... লজ্জায় স্যারের পদবন্দনা করে সাড়ে-পনেরোও করা হলো না!
অনেক দুঃখে, অতি কষ্টে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আমি কি কোনোদিনও ভূগোলে পাস করবো না?” ভদ্রলোক কতটা মরমী ছিলেন, আজ বুঝতে পারি...কোনো কথা বা সান্ত্বনা দেননি সেদিন। তবে, এয়ারপোর্টে ভোর চারটে থেকে রাত আটটা অবধি ডবল ডিউটি করেও বইয়ের কথা নিজের ভাষায় খাতায় লিখে নোট বানাতেন। রোববার, মাকে লুকিয়ে, খাতাটা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিলেন, “এটা পড়ে দেখো তো, বুঝতে পারো কিনা?” সেদিন এক বাপের মনের ব্যথা টের পাইনি ঠিকই কিন্তু ভূগোলের বই খুললেই যে ঘুমিয়ে পড়তাম, সেটা আর হলো না! তখন মাসে দুটো রবিবার দেখা হতো, পরের দেখায় বাবা আমাকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জিজ্ঞেস করে, বুঝিয়ে দিলেন। যে মাসে ভূগোল পরীক্ষা হতো, তার পরের মাসে ভূগোলের জায়গায় অন্য সাবজেক্ট হতো... তারপর, আবার ভূগোলের ভোগানি! তা দুমাস বাপ ব্যাটায় বেশ পরিশ্রম করলুম... পরের মাসে, সুভাষদা খাতা দিচ্ছেন, “চিরন্তন ঘোষ... ২৩”! এবারে আমার বিপুল উল্লাস, কারণ জানি আমি পাস করবোই, হয়তো বা সিক্সটি পার্সেন্ট ছুঁই ছুঁই। বেশ সপ্রতিভ ভাবেই গেলাম গোল্ডেন বয়েজদের পাশ দিয়ে। খাতা হাতে নিয়ে আমার চক্ষু চড়কগাছ! এতো ভূতের রাজার বর, জ্বলজ্বল করছে ৩২, এইটি পার্সেন্ট! অপ্রত্যাশিত ফল! এদিকে স্যার ও জিজ্ঞেস করছেন না টুকলি করেছি কিনা! আমি ভূগোলের ফেল্টু ফেলুদা, সেই গোল গোল শূন্যগুলো কোথায় মিলিয়ে গোল করে দিয়েছি? বোঝো কেত্তন!
তার পর ভূগোলে পাস করতাম কিনা, মাধ্যমিকে কত পেয়েছিলাম সব ভুলে গেছি। শুধু মনে আছে বাবার চোখ দুটো পরের রবিবারের, সেদিনও লোকটি পিঠ থাপড়ে দেননি, একান্তে বলেছিলেন, “ইচ্ছে করলে, সবই পারবে!” তার পরে জীবন চলতে কত গোল দিয়েছি, কত গোল ও গাল খেয়েছি, সবই ফিকে হয়ে গেছে। পড়ে আছে, নরেন্দ্রপুরের খেলার মাঠের ধারে বাপ ছেলের এক স্মৃতি!
- চিরন্তন
১৫ মার্চ ২০২১, আমস্টারডাম
পুনঃশ্চ: ফোনেটিক্যালি বাংলা টাইপ করি, বানান শুধরে দেবার জন্যে ধন্যবাদ Shibashis Acharya 🙏
Next > || অঙ্কেতে মাথা নেই…|