|| কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে ... ||
বাঙালির ধুতি-পাঞ্জাবি আজ উৎসব ছাড়া হারিয়ে যেতে বসেছে, নিম্নোক্ত এই হেরিটেজ খাবার দোকানগুলির মতো। পুজো, বিয়ে-বাড়ি আর কর্পোরেট এথনিক-ডে কে অবলম্বন করেই কি বাঙালির সাবেকি সাজ বছরের কটা দিন বেঁচে থাকবে? সাজ পোশাক, চিরকালই লোকের রুচি মত ... আমাদের, আর আজকের প্রজন্ম বেছে নিয়েছে চটজলদি আরামের পোশাক - তাই কি? স্টাইল জিনিসটা এমনি যে, মহিলারা কর্সেটের থেকেও অনেক অসুবিধেজনক পোশাক পরেন। ছেলেরাও পরেন অনেক জামা কাপড় যা, আরাম তো দূর, অস্বস্তির কারণ ...কিন্তু দেখতে ভালো লাগে! ইস্টাগ্রামে একটা তাক লাগিয়ে দেওয়াই যদি অভিপ্রায় হয়, নাহয় বাঙালির বাঙালিপনায় হোক? গরমের দিনে কলকাতার বুকে হিন্দিতে পানিপুরির হুকুম না দিয়ে, হয়ে যাক ধুতি-পাঞ্জাবি পরে ফুচকার আড্ডা? মেয়েরা এখনো শাড়ী পরাটা ধরে রেখেছেন কিন্তু পুরুষেরা ভুলেছেন পাজামা পরে বাজার করা, পাড়ার আড্ডা! বাঙালী কি এতটাই অনুকরণশীল যে নিজের ব্যক্তিত্ব খোয়াবে?
চলুন না, করোনার শেষে/ব্রেকে, সবাই মিলে সাধাসিধে শাড়ি, ধুতি/পাজামা-ফতুয়া/পাঞ্জাবি (লোক দেখানো বাহারি নয়) পরে এই সাবেকি প্রতিষ্ঠানগুলোতে হানা দি ... ২/৩ দিন? এঁদের আরো কিছুদিন ব্যাবসা করার সাহস জোগাবো আর নিজেরা পাবো ভুলে যাওয়া অতীতের স্বাদ! যারা প্রবাসী, তাঁরা কোলকাতায় ফিরে লোক খাওয়ান বড়ো বড় রেস্তোরাঁতে ... কোরোনার পরে, হোক কলরব! এবার থাবা মারুন এই হেরিটেজ খাবার পীঠস্থানগুলোতে, আগে ফোন করে বলে দিলে, দরকারমত তেল-ঝাল কম দেবেন এঁনারা।
তার সাথে স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি দেবে আপনাদের এই প্রজন্মের সেলফির স্বাদ। সাথে নিয়ে নিন আত্মীয়দের, পরিবার কাছে আসবে... দুঃখের দিনের সাথী পাবেন, নিউক্লিয়ার ফ্যামেলি যা দিতে পারে না! গেটটুগেদার করুন সহপাঠিদের নিয়ে, রাস্তায় বেরিয়ে সেই পুরোনো স্বরস্বতী পুজোর আনন্দটা হটাৎ উপভোগ করুন! সবাই মিলে উঠে পড়ুন ট্রামে, এসপ্ল্যানেড বা যেকোন ট্রাম ডিপো থেকে বেরিয়ে... উপভোগ করুন নিজের শহরকে, কোন এক রবিবার! নতুন প্রজন্মকে উপহার দিন সেই রোমান্টিক মেলাঙ্কলি! ইউরোপের কালচারতো দেখবেনই কিন্তু বাঙালির এই রসযোগ ফরাসী আবেগের থেকে কম নয়। দুপুরে খেতে বসুন মধ্যকলকাতার একটি নীল হেরিটেজ বোর্ডওলা রেস্তোরাঁতে ... শুনুন তাঁদের ইতিহাস ও গল্প। ভুরিভোজের পরে হাঁটতে-হাঁটতে বা হলুদ-কালো টক্সি করে গঙ্গার ধারে চলে আসুন। ঘণ্টা তিনেক কখন যে কেটে যাবে গঙ্গার বুকে নৌকোবিহারে, পান চিবুতে চিবুতে, গল্প-গাছার মাঝে টেরই পাবেন না! হাল্কা হেঁটে, দুলকি চালে আপনি যখন স্ববান্ধব কলেবরে, চার পাঁচটি ঘোড়ার গাড়ীর ৱ্যালি হাঁকিয়ে ভিক্টরিয়ার বাদমভাজা খাবেন তখন তার স্বাদই আলাদা!
আজ তো করোনার শেষে একত্ম-দিবস, ফুলটু আল্লাদ, শরতের রং লেগেছে আপনার কাছের জনের মনে ... নাই বা ফিরলেন এখুনি! নৌবিহারে যদি সূর্য ডোবার পালাটা মিস করে গিয়েই থাকেন, ক্ষতি কি? উঠে পড়ুন বিদ্যাসাগর সেতুতে, আমাদের পুরোনো হাওড়া ব্রিজের আলো দেখতে! ছোটদের বলুন সেই ম্যাকোলে সাহেবের বক্তৃতার কথা, যার পরে ভারত হারাতে থাকে তার স্বীয়-বিদ্যা ও সাংস্কৃতি .... কেন আজ বাঙালী হারাতে বসেছে নিজের পরিচয়! মুড়ি আর চপের সাথে চলুক সমবয়ষ্কদের সাথে - মি মারাঠি, পার্লে ভুঁ ফ্রন্সে বনাম বাঙালির আশা, বাঙালির ভাষা - বিতর্ক।
রাতের খাবারটা নাহয় চেনা বাঙালি চাইনিজ বা কন্টিনেন্টাল হলো, এটাও তো আমাদের মায়াময়ী কলকাতার এক অভীন্ন অঙ্গ। এঁঠো করে খাবার তোলেন না, সারভিং চামচে ব্যাবহার করেন … যদি বেশি পড়ে থাকে, নিয়ে নিন প্যাক করে। পথে যেতে যেতে ক্ষুধার্ত কারোর মুখে হাসি ফোটাতে পারবেন। যদি থাকেন পার্ক স্ট্রীট অঞ্চলে, ছোটরা সাথে না থাকলে, জানেনই তো কোথায় গেলে পাওয়া যায় এক পাত্তর আর সেই চেনা থিয়েটার/সঙ্গীত বা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা! শেষ কবে দোকান বন্ধ হবার আগে অব্ধি আডডা মেরেছেন? রাতে আমাদের কলকাতা এক স্বপ্নপুরী, হাঁটুন না কিছুদূর যানজটহীন রাস্তার ধার দিয়ে … সাথে আধবোজা সিগারেট বা আরো ভারী কিছু …আর শুধু স্মৃতি, বন্ধুত্বের টান ও টনটনে আবেগ!
আজকে আপনি ফেরৎ পেলেন অনেক কিছু, দিলেন আনন্দ - পরকে ও নিজেকে। হয়তো বা জেগে উঠলো বাঙালী সত্ত্বা, আজ রাতে পড়বেন কি রবীন্দ্রনাথ বা ভিন্ন স্বাদের এক বাঙালির উপাখ্যান? আগামীকালের কর্মব্যাস্ত দিনে আপনার আজকের কথা হয়তো মনে পড়বে না কিন্তু স্মৃতির প্রেক্ষাপটে, রোমন্থনের আর এক চালচিত্র আঁকা হয়ে গেছে, যা দেখবেন কোন একদিন একলা বসে বা নিজের চেনা মানুষের চোখের ছায়ায়। আপনাকে দেখে হয়তো আর দুজনের ভেতরের বাঙালী জেগে উঠলো, সেই অপেক্ষায় আমি রইলাম বসে। হয়তো, দেখা হবে কলকাতারই পথে আগন্তুকের বেশে, যখন আমি ফেরৎ যাবো আমার ওলন্দাজি সোনার খাঁচা ভেঙে। আপনাকে কিন্তু আমি চিনতে পারবো ... পোষাক দেখে, মনের পরিচয় পেয়ে!
- চিরন্তন
বিস্তারিত তালিকা পাবেন অদ্রিজার এই লেখাটিতে - খাদ্যরসিকদের জন্যে কলকাতার খাদ্যের ম্যাপ
https://aadrijaghosh.wordpress.com/2020/09/26/খাদ্যরসিকদের-জন্যে-কলকাত/
ক)কে সি দাস (১৯৩৫)
ঠিকানা: ১১ এ এবং বি, চিত্তরঞ্জন অ্যাভেনিউ, কলকাতা ৭০০ ০৬৯ (ধর্মতলার মোড়ের কাছে) খোলা থাকে: সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা
সেরা খাবার: রসগোল্লা
খ) নিরঞ্জন আগার (১৯২২)
ঠিকানা: ২৩৯/এ, চিত্তরঞ্জন অ্যাভেনিউ, কলকাতা ৭০০ ০০৬ (গিরিশ পার্ক মেট্রো স্টেশনের কাছে) খোলাথাকে: বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা
সেরা খাবার: এগ ডেভিল
গ)মিত্র কাফে: শোভাবাজার মেট্রো স্টেশনের উল্টোদিকে অবস্থিত এই দোকানের কবিরাজি (মাটন, চিকেনএবং মাছ)একবার খেতেই হয়
ঘ)গোলবাড়ির বিখ্যাত কষা মাংস: এর নামই বাঙালিদের মুখে জল নিয়ে আসে
ঙ)ইন্ডিয়ান কফি হাউস (১৯৪২)
ঠিকানা: ১৫, বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০১৪ (কলেজ স্ট্রিট প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির বিপরীতে) খোলা থাকে: বেলা ৯টা থেকে রাত ৯টা
সেরা খাবার: কফি
চ)প্যারামাউন্ট (১৯১৮)
ঠিকানা: ১/১/১/ডি, বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০ ০৭৩ খোলা থাকে: বেলা ১২টা থেকেরাত ৯.৩০
সেরা খাবার: শরবত
ছ)ইউ চিউ রেস্টুরেন্ট (১৯২৭)
ঠিকানা: ১২, গনেশ চন্দ্র অ্যাভেনিউ, কলকাতা ৭০০ ০১৩ (চৌরঙ্গী নর্থ, বো ব্যারাকের কাছে) খোলা থাকে: বেলা ১২টা থেকে ৩টে ও সন্ধে ৬.৩০ থেকে রাত ১০টা
সেরা খাবার: চাইনিজ
জ)সিরাজ (১৯৪১)
ঠিকানা: ১৩৫, পার্ক স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০১৪ (মল্লিক বাজার ক্রসিং-এ নিউরোসায়েন্স হসপিটালের পাশে) খোলা থাকে: বেলা ১২ থেকে রাত ১১.১৫
সেরা খাবার: বিরিয়ানি
ঝ)সাবির হোটেল (১৯৪৮)
ঠিকানা: ৩ ও ৫ বিপ্লবী অনুকুল চন্দ্র স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০৭২ (চাঁদনি চকের কাছে) খোলা থাকে: বেলা ৯টাথেকে রাত ১১টা
সেরা খাবার: রেজালা
ঞ)গিরিশ চন্দ্র দে ও নকুর চন্দ্র নন্দী (১৮৪৪)
ঠিকানা: ৫৬, রামদুলাল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০০৬ (হেদুয়ার বেথুন কলেজের কাছে)। খোলা থাকে: সকাল ৭টা থেকে রাত ১০.৩০।
সেরাখাবার: সন্দেশ
ট)দিলখুশা কেবিন (১৯১৮)
ঠিকানা: ৮৮, মহাত্মী গান্ধী রোড, কলকাতা ৭০০ ০০৯ (কলেজ স্ট্রিট ও মহাত্মা গান্ধী রোডের সংযোগস্থলেরকাছে)। খোলা থাকে: বেলা ১২টা থেকে রাত ৮.৩০
সেরা খাবার: কবিরাজি কাটলেট
