Sunday, May 22, 2022

অঙ্কেতে মাথা নেই

|| অঙ্কেতে মাথা নেই…||  

যারা আমাকে চেনেন, আলাদা করে বলে দিতে হবে না যে আঁক কষতে আমি চিরন্তন কাঁচা। ছোটবেলায় কে. সি. নাগের চৌবাচ্চায় পড়ে নাকানি চোবানি খেতাম আর বয়স কালের মনুষ্য চরিত্রের যোগ-বিয়োগ আমাকে দিলো ভাগের দিকে ঠেলে! একে-একে যে দুই হয়না কি করে জানি ছোটবেলাতেই বুঝতে পেরেছিলাম। দুয়ে দুইয়ে চারের চারা ফেলে মাছ তোলা শিখলাম ‘বড়ো’ হয়ে!

নার্সারিতে পড়তাম এক কনভেন্ট ইস্কুলে, পার্ক সার্কাসে। খুবই অল্প কথা মনে আছে, ছোটদের বাসে করে যেতাম লেকের কাছে অনিল রায় রোডের ভাড়া বাড়ি থেকে, জানলার ধারে হাওয়া খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়তাম আর ড্রাইভারদাদারা কোলে করে নামিয়ে দিতো ইস্কুলের ভারী লোহার দরজার সামনে। আধ-ঘুমন্ত অবস্থায়ই দাঁড়িয়ে আউড়ে যেতাম প্রেয়ারের গান, মানে না জানা কথার … শেষে ক্লাসে গিয়ে পুরো ঘুমে কাদা।এক মিশনারী সিস্টার ছিলেন কম বয়েসী কিন্তু হাতে স্কেল নিয়ে ঘুরতেন, আমার প্রতি এঁর বেশ নেকনজর ছিল।  আমি বরাবরই ব্যাক-বেঞ্চার, ক্ষুদে বয়েসেই সূচনা। বন্ধুত্ব হলো এক কালো অবাঙালী ভাই-বোনের সাথে, নাম স্মৃতিতে অস্ফুট কিন্তু দুজনেরই মুখ এখনো মনে আছে। পরে বুঝেছি, ভাইটি এক ক্লাস ফেল করে একসাথে পড়তো… সেই হলো আমার দোস্ত! ওর বোন ছিল নরম মনের, আমার মা টিফিনে স্বাস্থ্যকর ছানা দিলে, ওর ইচ্ছে না থাকলেও আমার বাস্কো খালি করে দিতো আর আমি খেতাম ওর মুখরোচক পুরি-ভাজি!ওয়ান-টুতে ভুল করতাম বলে দুই বন্ধু বকা খেতাম কিন্তু তখন বুঝতাম না একই দোষ করে দোস্তকে মিস্ রা কেন বেশী বকতো, শাস্তি দিতো। দাগির যে কি কষ্ট তা পরের জীবনে বুঝেছি। অঙ্কশাস্ত্রের গড়ের নিয়মটা যে ফাস্টবেঞ্চের যেকোন তিনজন বনাম আমাদের তিনজনের ওপরে প্রযোজ্য নয় তা শিশুমনেই প্রাঞ্জল হয়েছিল। তিনে-তিনে ছয়, কখনোই নয়! আমার রিপোর্ট কার্ড নাকি তখন ভালোই ছিল ... ব্যাপারটা গোলমেলে, কোনোদিনই ভালো ছাত্র ছিলাম না তাহলে, কি মা উৎসাহ দিতে অন্যভাবে বোঝাতো? সত্যি আজো নাগালের বাইরে তবে আমাদের ক্লাস টিচার মিসেস গঞ্জালভেস খুব ভালোবাসতেন ... ওয়ান-টু শিখিয়েছিলেন কমলা লজেন্স দিয়ে, পড়া পারলেই লজেন্সগুলো আমাদের। শিক্ষার এই মিষ্টি ভাষার নাম প্রোএক্টিভ এনফোর্সমেন্ট, পরে জেনেছি।

এর পরেই পড়লাম ছবি ভরা অংকের বইয়ের কবলে, পড়ি ক্লাস ওয়ান-টুতে পাঠ ভবনে। এক গুচ্ছ ফুল-ফল আর খেলনার ছবি দিয়ে যোগ বিয়োগ করতে হতো, এটা মজার ছিল, শুধু ছবির পাতাটা ভাবলেই হতো... ফটোগ্রাফিক মেমরি জিনিসটা পরে বুঝেছি। অংকের যুক্তি বুঝতাম না, কিন্তু visual similarity দিয়ে  যোগ বিয়োগ বেশ হয়ে যেত। দাদু দেখিয়ে বুঝিয়েছিল, বারান্দায় দুটো কাক... একটা উড়ে গেলে কটা থাকে? মুস্কিল হলো যখন তিনটে চড়াই নেমে এলো তুলসীগাছের চারা খেতে, কি করে চারটে হলো বুঝলাম না  - তিনটে চড়াই আর একটা কাক কোন হিসেবে চারটে পাখি হলো! ভয় পেতাম মেন্টাল ম্যাথস আর ডিক্টেসানকে, যমের মতো… টিচার নিজের মতো বলে যাচ্ছেন কিন্তু আমার ছবি মিল খাচ্ছে না। একটা হলুদ আম আর একটা লাল আম কি এক? তাহলে, দুটো কি করে হলো? যতক্ষনে আমি ভাবছি, টিচার চলে গেছেন ফুলের অংকে! অগত্যা যাহয় লিখে দিতাম, পুরো না হলেও অধিকাংশই ভুলে ভরা। সহপাঠিনী প্রথমা সব সময়েই গোল্ড ষ্টার পেয়ে প্রথমেই থাকতো আর চিরন্তন চিরকালই ব্ল্যাক স্টারে দাগি।  তখন থেকেই বোঝানো হয়েছিল যে দুটি শিশু কখনই এক নয়, তাই বোধকরি পরে দাদুর কমিউনিজমের, “সবাই এক” কথাটা বুঝতে দেরী হয়েছিল… সকলের অধিকার এক হয়? শূন্য একা থাকলে তার মূল্য নেই, অথচ কারোর পেছনে দাঁড়ালেই কি প্রতাপ! আমি সেই ফেল্টু শূন্য যার বন্ধু কম ছিল, কাকিমারা মিশতে না করতো - হঠাৎ তারাই আজ নেমন্তন্ন করে খাওয়ায়, চাকরির সোনার মোড়কের জন্যে… যেদিন কুর্সি যাবে, একলা দিশেহারা সেই বাচ্চাটার দেখা পাবো; যে কোনোদিনও অংকের rational ই খুঁজে পেলো না!

পাঠ ভবনে পড়া কালীনই বেশ বোঝা গেছিলো যে আমার দ্বারা পড়াশোনা হবে না।  বাবা-মা তো হাল ছাড়তে পারেন না, তাই হঠাৎই একবার নরেন্দ্রপুরের স্কুল দেখালেন। সেই দিন থেকেই আমার মন জুড়ে থাকলো, বিস্তীর্ণ খেলার মাঠ আর আম বাগান! যারা নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের সংস্পর্শে এসেছেন, অনেকেই ডক্টর প্ৰশান্ত গিরির নাম জানেন। বড়ো মনের শিক্ষক বলতে যা বোঝায় উনি তাই। কলেজের স্ট্যাটিস্টিকস বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন কিন্তু স্কুলের ছেলেরা ওঁকে প্রথম চিনেছিল খেলাধূলা স্পোর্টস্ ডে সঞ্চালক হিসেবে। উন্মুক্ত মনের মানুষ, ঠাকুর ও মায়ের ওপরে অচলা ভক্তি এবং সর্বক্ষণ মানুষের, বিশেষত ছাত্রদের, কল্যাণে নিমগ্ন। গরীব ছাত্রদের আশ্রয়, যারা পিছিয়ে পড়ছে তাদের উদ্বুদ্ধ করা ওঁনার ব্রত… লোক না জানিয়ে আজও করে চলেছেন সেই কাজ। বাবা তাঁকে দাদা বলেছিলেন, সেই সূত্রে আমার জেঠু, উনি আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন নরেন্দ্রপুর। ভীষণ ভালো লেগে গেলো একদিনের চেনা এই জেঠুকে আর তাঁর এই পরিবেশ। এহেন কোমল জেঠু যেদিন বললেন যে এখানে পড়তে হলে মা-বাবা, সবাইকে ছেড়ে থাকতে হয়, একটুও বুক কাঁপেনি। বল্লেন, পরীক্ষায় পাশ করলে তবেই ঢুকতে পারবো। আমদানি হলো কে. সি. নাগের অংকের বই, জেঠুর এক আত্মীয় ভাই, চিত্ত কাকু আমাকে পড়াতে লাগলো।জেঠু যতটাই নরম, চাঁদমামা পড়তে দিতেন, চিত্ত কাকু ততটাই শক্ত হাতে লসাগু গসাগু নিয়ে পড়লো! এই প্রথম অংকের জেরবারের একটা সুফল দেখলাম, এদিকে পাঠ ভবনের পরীক্ষার ফল ভালো হলো ক্লাস ফোরের ফাইনালে! তিন-দুগুনে-ছয়, আমার অল্প কাটলো ভয়!

অন্য লোকের হয়তো বলতে লজ্জা লাগবে কিন্তু আমি বেহায়া, তাই সত্যিটাই বলছি… একবারে নরেন্দ্রপুরের এণ্ট্রান্স পরীক্ষায় ঢুকতে পারিনি। পরীক্ষা দেওয়ার পর, একদিন স্কুলে যাবার পথে একটা পলায়নরত তেলের ট্যাংকারের মদ্যপ ড্রাইভার আমাকে হাল্কা ছুঁয়ে দিয়ে পগার পার। ঝন্টুদা আমাকে ঠেলে দিয়েছিলো পেছন দিকে তাও ঠ্যাং ভেঙে বিছানায় মাস খানেক কাটালাম। শেষের দিকে দাঁড়াতে বললে পারতাম না, মা জোর করে যন্ত্রণার মধ্যেই হাঁটানো অভ্যেস করাতো … সাহস দিত, “নরেন্দ্রপুরের মাঠে খেলবে না?” বলে। একদিকে আমি চেষ্টা করছি দাঁড়াতে আর ওদিকে সবাই গোপন করছে আমার চান্স না পাওয়ার সংবাদ! রাখে কেষ্ট, মারে কে? হঠাৎ বাবা একদিন আমাকে নরেন্দ্রপুরে নিয়ে গেল ট্যাক্সি করে, আবার পরীক্ষা দিলাম জনা কুড়ি ছেলেদের সাথে।
এক মধ্যবিত্ত বাপ, তার মাস মাইনের কতটা দিয়ে পার্ক সার্কাস থেকে গড়িয়ার জ্যাম ঠেলে নরেন্দ্রপুরে নিয়ে যায় মিটার পুড়িয়ে, তার পরিমাপ বা মূল্যায়ন আজও করতে পারি না! ট্যাক্সি চড়া ছিল আমাদের কাছে রাজকীয় ব্যাপার, তাও বাবা নিয়ে চলেছে যাতে ছেলের পায়ে না ব্যথা লাগে, অথচ জীবন যুদ্ধে নিজের পায়ের ওপরে দাঁড়ানোর প্রশিক্ষণ পেতে। রাতে ঠাম্মার কাছ থেকে জানলাম, দুটো সিট খালি হয়েছে তাই আমার জীবনে দ্বিতীয় বার এক সুবর্ণ সুযোগ এসেছে! 

তিন-ছয়ে-আঠেরো … বাঘে ছুঁলে আঠেরো ঘা, সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য! হঠাৎ খবর এলো যে আমি সত্যি নরেন্দ্রপুরে অ্যাডমিশন পেয়েছি! বাঘা-বাঘা শিক্ষকদের কাছে ছেলে পড়তে পারবে শুনে মা আনন্দে আটখানা আর বাবা বল্লো, “পেয়ে তো গেছো কিন্তু যাবার কি দরকার? ছুটি ছাড়া বাড়ী আসতে দেবে না!” আমার মন জুড়ে খেলার মাঠের ছবি, দোদো অর্থাৎ ঠাকুরদাকে ধরে বাবাকে রাজি করানো হলো। সব থেকে ভালো লাগলো পুরোনো ইস্কুলে টি.সি. নিতে এসে, কোন দিন যে টিচাররা পাত্তা দেননি, উল্টে অচ্ছুতের মতো দেখতেন তাঁরাই কত উপদেশ দিলেন… সহপাঠীরা সসম্ভ্রমে তাকিয়ে নতুন জন্তু দেখলো! ব্যতিক্রম, ক্লাস ওয়ানের এলা মিস, প্রথম যখন এই স্কুলে এসেছিলাম, ইনিই আদর করে কাছে টেনে নিয়েছিলেন … আজ যাওয়ার পালায়ও জড়িয়ে ধরে কপট রাগে চোখ বড়ো করে বকে প্রবীণ শিক্ষিকা বললেন, “নো মোর টক, মিস্টার টকেটিভ, মনে থাকবে তো?” যখন সবার কাছেই ছিলাম ফেলনা, যে দুতিনজন খেলায় নিতো, আজ তারা চুপচাপ। বিয়োগের ব্যথা, চিরকালই নীরব … দুই ভাগে আঠেরো কত হয়? আমার মন বলে, এখন নয়!

নতুন ইস্কুলে এসে দেখি, একি - কোথায় সেই দিগন্ত-জোড়া-মাঠ? এতো গোছানো এক জায়গা, ছোট-ছোট মাঠ-পার্ক-ছোটদের চিড়িয়াখানা (হরিণ, খরগোশ, পাখি, গিনিপিগ, কচ্ছপ - সব আছে) আর চারদিকে চারটে বিশাল তিনতলা বাড়ি। মনের ছবির সাথে এর কোনো মিল নেই, শুনলাম যা দেখে মন প্রলুব্ধ হয়েছিল তার নাম ‘সিনিয়র সেকশন’, ক্লাস সেভেন হলেই সেখানে যাওয়া যায় … এক সঙ্গে আঠেরো ঘা খেলাম! কোনোদিন বাপ-মা ছাড়া থাকিনি বিশেষ, খুব বেশী হলে দোদোর সুভাষ গ্রামের বা মাইমার (বাবার মাইমা) বাড়ি এক সপ্তাহ থেকেছি গরমের ছুটিতে। এক ধাক্কায় শিখলাম - ধুতি পরা, বাসন মাজা আর কি করে প্রিয়জনদের ছাড়া থাকতে হয়। পরে শুনেছি যে আমার কোলের বোনটা দুদিন টানা কেঁদেছিলো… আসলে যাবার সময় বুঝতেই পারেনি যে দাদামনির সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলো! মা-বাবার কথা নাই বা বললাম। এবারে শিখলাম ভাগ করা, একার দুঃখ কি করে ভাগ করে নিতে হয় শেখালো নতুন সহপাঠী ভাইয়েরা! 
সকলেই সমবয়েসী, 
“আছে দুঃখ, … বিরহ দহন লাগে      
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে” 
- দেশের না হলেও দশের দুঃখ দশ জনে ভাগ করলে, পড়ে থাকে শূন্য। এই সেই শূন্য, যার গাঁথা শুধু ব্রহ্মগুপ্ত না স্বামীজীও গেয়েছিলেন। 

বেশ লেগেছিলো অঙ্কের এই খেলা, এমন সময়ে আমাদের অংকের ক্লাসে আবির্ভাব ঘটলো কৃষ্ণদার। শ্যাম-বর্ণ, কেষ্ট ঠাকুরের মতোই কোঁকড়ানো চুল, পরিপাটি করে আঁচড়ানো, পাতলা গোঁফ, গালে আঁচিল … স্কুটার করে আসতেন স্কুলে, বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলতেন ক্লাসে। ভালো ছেলেরা ক্লাস আলো করে প্রথম বেঞ্চিতে বসে সব আঁক করে ফেলতো নিমেষে, আর অন্য প্রান্তে শেষের বেঞ্চির লাল কালির ছাত্ররা, অর্থাৎ আমার মতো দুয়েক পিস্ অপেক্ষা করতো পিরিয়ড শেষের বেলের। একদিন মাসিক পরীক্ষার খাতা দিতে দিতে আকর্ণ বিকশিত হেসে বললেন, “এইযে পাঠ-ভবনের পাঁঠা, এবারো পাস করতে পারলে না? এবার মাঠে না চরে বইয়ে ঢোকো!” তারপরই নিল ডাউন! কোনটা বেশি মর্মান্তিক, এক নতুন ছাত্রের পক্ষে … তা অনুভব করা সকলের পক্ষে সম্ভব না। পরে এক দিকপাল শিক্ষক বলেছিলেন, “কিছু লোকে লক্ষ্মী পুজোয় ব্যস্ত থাকেন আর কিছু শিক্ষক সরস্বতীর আরাধনায়!” নরেন্দ্রপুরের শিক্ষকদের ভীষণ দাম ছিল বাইরে, কৃষ্ণদার গড়িয়ার টিউটোরিয়ালে তিল ধারণের জায়গা থাকতো না শুনেছি - ওদিকে লাইফ সায়েন্সের অজিতদা স্কুলের ছেলেদের বাইরে পড়াতেন না, বলতেন স্কুলে ডিপার্টমেন্টে আসবি পুরোটা বুঝিয়ে দেব! গুরুর আসন যে কোথায়, শিখেছি অজিতদার মতো নমস্য শিক্ষকদের কাছ থেকে, দুহাতে বিলিয়েছেন বিদ্যা, কিছুই চাননি - পেয়েছেন আজীবন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। পরের জীবনে, জীবন-বিজ্ঞানের প্রবীণ শিক্ষক যখন ধুঁকছেন দুরারোগ্য ফুসফুসের রোগে - অনেকে চেয়েছিলেন ওঁকে বিদেশে বড়ো স্পেশালিস্ট হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাতে। অজিতদা রাজি হননি, তিনি বলেছিলেন, “সেখানে চিকিৎসা হবে এক সাধারণ রোগীর, আর এখানে আমার ছেলেরা দেখবে তাদের অজিতদাকে!” কি আত্মবিশ্বাস এক আচার্যের, স্বীয় শিষ্যের শ্রদ্ধা ও শিক্ষার প্রতি — স্বামীজী মনে হয় এঁদেরই বরপুত্র করেছিলেন! নিজের শেষ নিঃশ্বাস আমাদের অজিতদা ছেড়েছিলেন অনেক ডাক্তার দাদাদের কাঁদিয়ে। আর আমরা ছিলাম স্তব্ধ, বিশ্বের নানা দেশে অনেক ছাত্রদেরই সেদিন মুখে ভাত রোচেনি। মনের হাহাকার ভরা শূন্য দিয়ে কোন কিছু ভাগ করলে তা হয়ে যায় ∞ অনন্ত, অসীমত্ব যার ব্যাপ্তি… সেদিন শিখেছিলাম এই অংক! 

আমার প্রিয় এই teacher ভদ্রলোকটি ব্যাপক ধূমপান করতেন, ক্লাস এ text বই পড়াতেন না - টেবিল এর ওপরে এক পা গুটিয়ে, সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা, চোখ বোজা বকের মতো দাঁড়িয়ে পড়াতেন | ক্লাস ৯ এই মাধ্যমিক এর পুরো কোর্স শেষ করতেন, আর আমরা থাকতাম মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে | জানি না অজিতদার ক্লাস করার পরে কেউ ওনাকে ছাড়া আর কাউকে ফেভরিট teacher বলতে পারতো কিনা! মাধ্যমিক এর পর নরেন্দ্রপুর ছেড়েছি, গড়িয়াহাট এর schematic tutorialএ পড়তাম শুধু মেয়েদের লাইন মারবো বলে | এহেন নন্দী স্ট্রিটে, হঠাৎ অজিতদার সাথে গলির বাঁকে আচম্বিতে দেখা! সম্মান দিয়ে tap করা ciggiটা পেছনে ফেলে  দিয়েছিলাম - সৌম্য ব্যানার্জী আর আমি - উনি বলেছিলেন, "আদ্দেক ধূপকাঠিটা যে ফেলে দিলি, গুরুভক্তিটা খরচে  পোষাবে, নাকি গলিতে গিয়ে গালাগাল দিবি?" বলে এক গাল হেসে পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন, বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন | বলেছিলেন, "আনন্দ কর, পড়াশোনাটা secondary, মনটাকে নষ্ট হতে দিস না!" এই ছিলেন আমাদের অজিতদা - pragmatic, যুগোপযোগী এবং সত্যিকারের মূল্যবোধ শিক্ষা দিতেন, কোনো দ্বিচারিতা ছিল না | সত্যি আজকের দিনে মূল্যবোধের বড়োই অভাব কিন্তু উনি শিখিয়েছিলেন binomial বা দ্বিপদের সঠিক সংজ্ঞা!

লাভের অঙ্কটা ঠিক কষে উঠতে পারি না... অনেকের কাছেই আজও সেই বোকা, বকরা এবং naive আছি।সংসার বলতে চারটি প্রাণীকে ঘিরে জীবন, একটু বুদ্ধু না হলে ভূতুম কোথায় পাবো সাথে, পান সুপুরির নৌকোয় পাড়ি দিতে? চাকরির চাকরগিরি এবং ভ্রান্ত উন্নতির স্বপ্নের পেছনে ধেয়ে, আজ:
কুড়ি দুগুণে "চালিশ"
কোলে নেই পাশবালিশ!!

আমরা দুএকজন ছিলাম যারা ০১ থেকে ১০ ও পেতাম ৪০ এর মধ্য, এদিকে ১৬ পেলেই পাস! সেই শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্তের মেজদার মতো পাসের পড়া পড়তে হতো আমাদের কিছু লাল কালি ছেলেদের বিকেলে মহারাজের ঘরের সামনের বারান্দায়… এর নাম ছিল পাঠশালা।ওয়ার্ডেন মহারাজের ডাক নাম নারানদা, উনি আবার ইস্কুলে অঙ্কের ক্লাস ও নিতেন, পড়া না পারলে দুই জুলপি ধরে জমি থেকে এক হাত উঠিয়ে দিতেন, চুল উপড়ে এঁর হাতেই লেগে থাকতো! আপাত দৃষ্টিতে কীচক আর কংসের সাথে মিল পেতাম আমরা। ক্লাস সিক্স, ছেলেদের চোখে আঞ্জনি হচ্ছে শুনে আমার মা চোখের ড্রপ পাঠিয়ে দিয়েছিলো। আমার রুমমেট লহরীর (অভিজ্ঞান) চোখ ফুলে লাল আর আমি ডাক্তারী ফলাচ্ছি, ওষুধের গুনে শ্যাম্পুর (সম্পূরণ) চোখ ভালো হয়ে গেলো। ব্যস আমি তো হিট ডাক্তার, খবর  পৌঁছলো এ হেন নারানদার কাছে! স্বভাবসিদ্ধ ভাবে, নাড়ু আমাকে ডাকলেন, “চিরন্তন, চি-রন-তন! কিঞ্চিৎ এদিকে আয়!” এসেই দেখি একতলার বারান্দায় বেঞ্চিতে অধিষ্ঠিত হয়ে বিশ্রামরত আমাদের ভুলোকে কালো দাদু-ছাতার লোহা বাঁধানো অংশ দিয়ে বেদম ঠ্যাঙালেন। নির্বাক প্রাণীটা অপরাধ ও বুঝতে পারলো না, ককিয়ে উঠে লেংচাতে-লেংচাতে পালিয়ে গেলো! আমার তো পিলে বা অন্য কিছু টাকে উঠে গেল, বাইরে বিকট রোদ … স্টিলের বিনুনি করা ওয়্যার-ম্যাটগুলো আগুনের মতো তেতে আছে, যদি নিলডাউন করান মাংস খুবলে আসবে!  যাই হোক নাড়ু অংকেতে ১২ পেয়েছি বলে বেশ দুকথা শুনিয়ে, তার পর ভালো ভালো উপদেশ দিয়ে বললেন… “তুই নাকি রোগ নিরাময় করছিস?” আমার ভুলোর কথা মনে পড়লো, আড়চোখে দেখলাম ছাতিটা ওনার হাতের কাছেই আছে... এক ঘায়ে সোজা আরোগ্য ভবন (স্কুলের হাসপাতাল) পাঠিয়ে দিলে তাও চার পাঁচ দিন ইস্কুল ফাঁকি দেওয়া যাবে! সাহস করে এগিয়ে গেলাম, উনি বললেন চোখে ড্রপ দিতে। দুদিন আগে এক সহপাঠীর সাথে কথা হচ্ছিলো নাড়ুর টাকে হাত বোলানোর দুঃসাহসের… তাকে ডেকে বললাম, “স্টক বেট ফ্যাল আজই আমি নাড়ুর টাকে হাত বোলাবো!”… স্টক মানে বাড়ি থেকে দিয়ে যাওয়া খাবার যথা বিস্কুট,ভাজা ভুজি। এগুলো রাখা ছিল নিয়ম বিরুদ্ধ, ছাত্রদের মধ্যে বৈষয়িক ব্যবধান দূর করতে। সহপাঠীর মনেও probabilityর অঙ্ক খেলে গেল, আমার হারার চান্স অনেক বেশী, ব্যস বাজি পড়লো আমার একটা বোরবনের প্যাকেট আর ওর দু প্যাকেট নিমকি আর এক প্যাকেট চিঁড়েভাজা। আমি হারলে নাড়ুর বিকট ঠ্যাঙানি হবে আমার উপরি পাওনা আর বন্ধুদের বিনোদন। মা দুতিনটে চোখের ড্রপ দিয়েছিলো, তার একটা শিশি খালি হয়ে গেছিলো। শুনেছিলাম স্যালাইন ওয়াটার চোখের পক্ষে ভালো, আরো জানতাম নুন কাটা জায়গায় লাগলে জ্বলে - দুটোই ভালো ব্যাপার নাড়ুর জন্য। দৌড়ে ডাইনিং হল থেকে খোলা বাটিতে পড়ে থাকা এক খাবলা নুন এনে, গ্লাসে জল দিয়ে যত পারলাম মেশালাম। তারপর শিশিতে ঢেলে প্লাস্টিকের ড্রপার মুখটা ভালো করে এঁটে এলাম নাড়ুর কাছে। ওদিকে ব্লকের গ্রিলের সামনে সবাই দাঁড়িয়ে কখন চিরুবধ প্রহসন শুরু হবে। নাড়ু জিজ্ঞেস করলেন এতো দেরি হলো কেন, আমিও বেমালুম গুল মারলাম, “আপনাকে খোলা ওষুধ দিলে যদি অভিজ্ঞানের থেকে আপনার হয়ে যায়, তাই নতুন সীল খুলতে টাইম লাগছিলো!”… নাড়ু ফ্ল্যাট! বললেন, “বেশ বেশ, ভালো করে লাগিয়ে দে!”। এইটে ছিল আমার জীবনের অন্যতম নন্টে-ফন্টে মুহূর্ত! ফট করে ওনাকে বললুম চোখ বন্ধ করতে। পেছনে হাত দেখিয়ে বন্ধুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, বাঁ হাতের তালু নাড়ুর টাকে আর ডান হাত দিয়ে যেন চোখ পরিষ্কার করছি তুলো দিয়ে। যাই হোক যতটা পারলাম নাড়ুর টাকে হাত বোলালাম … মানসপটে কল্পনা করছি নন্টে সুপারিনটেনডেন্ট স্যার এর মুণ্ডিত মস্তকে তবলা বাদন করছে! হঠাৎ নাড়ু গম্ভীর ভাবে বললেন, “কর কর কচ্ছে, এতো জ্বলে কেন?” আমি বোঝালাম খুব ভালো ওষুধ তাই এতো তাড়াতাড়ি কাজ দিচ্ছে! ক-ফোঁটা নুন জল নাড়ুর চোখে তিন চারদিনে দিয়েছিলাম জানি না কিন্তু বিটলে ব্যাটা অন্ধ হয়নি। আপনারা হয়তো ভাবছেন কী সাংঘাতিক ছোঁড়া, ভাগ্যিশ সত্যি ডাক্তার হয়নি! আমি হলফ করে বলতে পারি, আপনারা যদি আমাদের আদ্দেক নাড়ুর গো-বেড়েন বা ওয়্যার ম্যাটে হাঁটুর মাংস খাবলাবার অবস্থায় পড়তেন তাহলে আমার মতো অংকে ফেল্টুকে হিরোর চোখে দেখতেন!

যদি করো ভাগ, তুমি একটি আস্ত ছাগ!
করে যাও গুণ, বাড়া ভাতে গব্যঘৃত নুন!

উপরোক্ত স্মৃতিচারণ পড়ে যদি মনে হয়, নরেন্দ্রপুর মানেই শুধু ঠ্যাঙানি আর শাসন, বড়োই ভুল ও অবিচার হবে। ছিল শিক্ষকদের অকৃত্রিম ভালোবাসা, প্রশ্রয় এবং কিশোরদের এগিয়ে চলার একমাত্র উপাদান — উৎসাহ দান! আমাদের হেন শিক্ষক ছিলেন না যাঁরা চাইলে দুহাতে টাকা কামাতে পারতেন কিন্তু শিক্ষাদান ছিল তাঁদের ব্রত, জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মানুষ তৈরী করতে স্বামীজীর ডাকে - সারা জীবন পড়ে রইলেন নরেন্দ্রপুর নামের গ্রামে। জানি না, আমরা তাঁদের এই আত্মত্যাগের দাম দিতে পেরেছি কিনা  — গুরুদক্ষিণা, সে এ জন্মে শোধ হবে না! কেন? 

শোনাই আমাদের জ্যামিতির মাস্টারমশাই প্রসূন মুখার্জীদার অদ্ভুত শেখানোর পরিভাষা। পাই এর বৃত্ত ও ছক কাটছেন ব্ল্যাক বোর্ডে, কাঠ আর তামা দিয়ে তৈরী সেই বিশাল কম্পাস যার আগায় চক ঢোকানো যায়।  আমার পড়ার দিকে মন নেই খালি ভাবছি কি করে কম্পাসটা হাতিয়ে আঁকি বুঁকি কাটবো বোর্ডে। প্রসূনদা কিছু প্রশ্ন করলেন, আগুপিছু না ভেবে লাস্ট বেঞ্চি থেকে ধাঁ করে হাত তুললাম, স্যার আর বন্ধুরা অবাক … মড়া করে কি! স্যার আবার শুধোলেন, আমি বললাম যে স্যার এঁকে দেখিয়ে দিতে পারি। দোতলার বাঁদিকের ক্লাস রুমে ছিলাম, নিচে ভেতরের বাগান দেখা যায়, সেখানে একটা ডিসাইন ছিলো বৃত্তর ভেতরে বৃত্ত concentric circles, ব্যাপারটা মনে গেঁথে গেছিলো। উৎসাহ সহকারে কম্পাস দিয়ে সেইটাই এঁকে চললাম! স্যার কিন্তু তাড়া লাগালেন না, শেষ হয়ে গেলে বললেন, “এটা কি অতীনদার ক্লাস?” অতীনদা আমাদের আঁকার ক্লাস নিতেন। আমার তো শখ পূরণ হয়ে গ্যাছে এবারে ক্যাল খাবার জন্য প্রস্তুত, সবাই হাসছে। প্রসূনদা হাল্কা করে কানটা টেনে বসতে বললেন! ক্লাসের শেষে আমাকে বললেন ব্ল্যাক বোর্ডে আঁকার কম্পাস, ডিভাইডার গুলো নিয়ে আসতে একতলার অংকের ডিপার্টমেন্টে। আমার আনন্দ দেখে কে? স্যারের পেছন পেছন নিয়ে এলাম, ডিপার্টমেন্টে সন্তোষ কাপ্রিদাও ছিলেন। এবার নিলডাউন ঠেকায় কে? প্রসূনদা বললেন, “বইয়ের এক পাতাও পড়েছিস?” আমি সাহসে ভর করে বললুম যে ডেফিনেশনগুলো মনে আছে। স্যার কিছু একটা জিজ্ঞেস করলেন, সম্ভবত ভুল উত্তর দিলুম। তারপর স্যার বললেন, “ক্লাসে যেটা কম্পাস দিয়ে এঁকেছিলি, খালি হাতে আঁক তো দেখি!” আঁকলাম, প্রসূনদা বল্লেন, “এটাকে কি বলে জানিস?” তারপর বললেন পাই, গোল্ডেন রেসিও, দাভিঞ্চি আর ল্য কুবসিয়ের গল্প! যে ছাত্র বই হাতেও করে দেখে না তাকে তিনি এমন শিক্ষা দিলেন যে প্রায় বাইশ বছর পরে ল্য কুবসিয়ের বাড়ি গিয়ে শুধু তাঁর কথাই মনে পড়লো। জীবনে অনেক বার গোল্ডেন রেসিও ব্যবহার করেছি - আঁকাতে, ডিসাইনে এবং ভজঘট ITর থিওরি বোঝাতে, অনেকে বলেছেন “artfully explained” - এই প্রাপ্তি আমার নয়, প্রসূনদার। 🙏🏽

সত্যি আমার অঙ্কেতে মাথা নেই হয়েছি পাগল, কৃষ্ণদা ঠিকই চিনেছিলেন পাঁঠাটাকে! তবু আজ যতটুকু বাজেট বা প্রফিটেবিলিটির অঙ্ক কষতে পারি সবই আমাদের প্রণম্য শিক্ষকদের অবদান। 

তিন কুড়িং ষাট,
সাঙ্গ আমার বাত!

— চিরন্তন
২৭ মে ২০২২, বেক বাগান, কলকাতা 

পুনশ্চ:  গুগুলের ফোনেটিক টাইপিং ব্যবহার করি, বানান ভুল শুধরে দিলো শিক্ষক বন্ধু Shibashis🙏

💀ভূত চতুর্দশী ও বাঙালী আচার বিচার 👻

  ভূত চতুর্দশী হচ্ছে বাংলার একটি প্রাচীন আদিবাংলা হিন্দু উৎসব, যা মূলত কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে (অমাবস্যার ঠিক আগে) পালিত হ...