সিরিজের শেষের ভাগের নতুন অধ্যায়:
|| হয়েছি পাগল …||
১. | বেচো লা স্পিশিস |
স্যার প্রায় মিনিট দশেকের পরিশ্রমে ব্ল্যাক বোর্ডে একটা জোড়া পাতা এঁকে ঘাম মুছলেন। ফার্স্ট বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কি স্পিশিস?” সাঁই করে তিন চারটে হাত উঠে গেল মাথা ছাড়িয়ে।এদিকে, আমি আপন মনে স্যারের বাঁদিকের খোলা জানলা দিয়ে দূরে পুকুরের পাশ দিয়ে আল ধরে সর্ষে ক্ষেতে প্রায় নেমে পড়েছি। কোঁৎ করে কুনুইয়ের খোঁচা খেয়ে দেখি, বারীন চোখ দিয়ে নতুন লাইফ সায়েন্সের মাস্টার মশাইয়ের দিকে তাকাতে ইশারা করছে। আমাদের আগের জীব-বিজ্ঞানের স্যার, নারায়ানদা খুব শান্ত, নিরীহ এবং ভালোমানুষ গোছের ছিলেন। আমার মতো গরু-গাধা পড়া না পারলে বুঝিয়ে দিতেন, ক্লাসে গোল পাকালে তাকিয়ে কপট রাগে বলতেন, “কি হচ্ছে টা কি? দেব বের করে!” আমরাও খানিক্ষন চুপ। পুজো বা গরমের ছুটির পর ফেরত এসে মান্থলি পরীক্ষার খাতা পাবার আগে, আজ প্রথম ক্লাসে দেখি নতুন স্যার নারায়ানদা জায়গায়! যাই হোক, স্যার এর দিয়ে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলাম, নিশ্চিত নিল-ডাউন করিয়ে দেবেন - প্রশ্নটাই তো শুনিনি!
অদ্ভুত ব্যাপার, নতুন স্যার খুবই আস্তে আস্তে কোমল ভাবে আবার জিজ্ঞেসা করলেন। আমি আমতা আমতা করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছি, উনি উৎসাহ দিলেন, “ভয় কি বলে ফেলো, হোয়াট ইজ দি স্পিশিস অব দিস প্লান্ট?” ব্যাস, মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “কচুর কিংবা কচুর কিছু স্পিশিস হবে স্যার!” সহপাঠীরা হো হো করে হেসে ঢলে পড়ছে! স্যার ভাবছেন আমি ছ্যাবলামি করে বাহাদুরি দেখাচ্ছি।এদিকে আমার অবস্থা সঙ্গীন, মন পড়ে ছিল পুকুর পাড়ে, ওখানের কচু পাতা যেন স্যারের আঁকা ব্ল্যাক বোর্ডে জুড়ে বসেছে; যা মনে এসেছিলো তাই বলেছি! বোধ হয় নতুন স্যার আজ প্রথম দিন বলে ছেড়ে দিলেন কিন্তু সহপাঠীরা, ‘কচুর স্পিশিস’ বলে খেপিয়েই চললো, মাঠে-ঘাটে-খাটে! প্রথম প্রথম খারাপ লাগলেও মানিয়ে নিতে হল।এর পর থেকে নতুন স্যার, বাসুদেবদা আমাকে খালি সব কিছুর সাইন্টিফিক নাম জিজ্ঞাসা আর বেশ হুল যুক্ত বিশেষণ প্রয়োগ করতেন। রুই (Labeo Rohita), কাতলা মাছের (Labeo catla) আর কাকের (Corvus) নামটাই বলতে পারতাম, বাকি সব এর ল্যাটিন আমার কাছে ল্যাট্রিন হয়ে যেত। এর পর একদিন পরীক্ষার খাতা বেরোলো, আমি ফেল! আমার দৃঢ় বিশ্বাস, নারায়ানদা খাতা দেখলে আমি পাশ করতামই করতাম। নতুন স্যারের নাম দিলাম ‘বেচো লা স্পিশিস’, যারা আমার মতো লাল কালির দাগ পেয়েছিলো তাদের বেশ মনে ধরলো নামটা! একে ফেল করেছি তার ওপরে জগা, ‘কচুর স্পিশিস’ করে করে আরো ক্ষেপিয়ে তুললো। যত রাগ গিয়ে পড়লো বাসুদেবদার ওপরে! ঠিক করলাম আজি প্রতিশোধ নিতে হবে।
বাসুদেবদা আমাদের ভবনেই (হোস্টেল বিল্ডিং) থাকতেন তিন তলাতে, তাই ওনাকে আমাদের স্টাডি হল নিতে হতো। স্কুল থেকে ফিরেই, স্টাডিহল এর সামনে নোটিশ বোর্ডের রুটিন চার্টে দেখি আজ সন্ধেতে বাসুদেবদার স্টাডি হল। অর্থাৎ আমরা সবাই ডেস্কে বসে নিজের নিজের পড়া করবো আর কিছু আটকে গেলে বা জিজ্ঞাস্য থাকলে সামনের চৌকীর ওপরে চেয়ার টেবিলে বসা বাসুদেবদাকে জিজ্ঞেস করবো। প্রতি দিন সকালে ও বিকালে, প্রার্থনার পর আমরা স্টাডি হলে বসতাম, খেতে যাবার আগে পর্যন্ত।সেদিন, আমি খেলতে গেলাম না বিকেলে, ঘরে বিছানার তক্তপোশের ওপরে মুখ গুঁজে ঠায় বসে রইলাম। রুমমেট অভিজ্ঞান বোঝানোর চেষ্টা করে শেষে খেলার মাঠের দিকে ছুটলো। সবাই চলে যাবার পর, আমি চুপিচুপি বেরিয়ে স্টাডি হল এর সামনে এলাম। ঢোকার বড় বড় তিনটে দরজা পাশাপাশি; মাঝখানের আর পেছনের দরজাগুলো ভেতর থেকে ছিটকিনি দেওয়া, শুধু প্রথম দরজাটায় তালা লাগানো। ওই তালার চাবি ওয়ার্ডেন নারায়ণ মহারাজের অর্থাৎ নাড়ুর ঘরে। নাড়ুর ঘর থেকে চাবি সরানো আর বাঘের বাড়ি সিঁদ দেওয়া একই কথা! কি-করি কি-করি ভাবতে ভাবতে হটাৎ খেয়াল করলাম দরজার মাথায় একটা সামন্তরাল জানলা আছে, যেটাকে আমরা স্কাইলাইট বলতাম কিন্তু এটা আদৌ ছাতে লাগানো স্কাইলাইট নয়। দরজার মাথার ওপরে চতুষ্কোণ একটা জানলা, যার মাঝে একটাই লোহার শিক থাকতো; ঠেলে খুলে দিলে, জানলার কাঁচটা মেঝের সামন্তরাল হয়ে থাকতো যাতে ওপর আর নিচ দিয়ে হাওয়া খেলে।
মুশকিলের ব্যাপার এই যে স্কাইলাইটগুলো নিয়মিত খোলা হতো না, তাই জমে আটকে থাকতো।
আমাদের থাকার পাঁচ-ছটা কামরাগুলোর সামনে একটা টানা বারান্দা থাকতো; এই কামরা, কমন বাথরুম এবং বারান্দা মিলে হতো একটা ব্লক। এই ব্লক পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব ছিলো আমাদের ওপরেই, তার জন্য থাকতো একটা পেল্লাই কাঠের T আকারের - ব্রুম, বাথরুমের জন্যে স্ক্রাপার এবং তিনটে মজবুত কাঠের ডাস্টবিন। ডাস্টবিনগুলো বেশ ভারী হতো, তার কাঠের ঢাকনীগুলাও মজবুত ছিল... কায়দা করে ডাস্টবিনের ওপরে দাঁড়ানো যেত। আমাদের অনির্বান পাল ছিল ভীষণ ছটফটে কিন্তু ভীষণ সরল ও অমায়িক প্রকৃতির ছেলে। তা দেখি প্যালা কোথা থেকে ফিরছে, ওকে পাকড়াও করে এহেন একটা ডাস্টবিন টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এলাম দুজনে স্টাডি হলের মাঝের দরজার সামনে। প্যালারামকে যত বলি ডাস্টবিনটাকে শক্ত করে ধর, সে ব্যাটা ভয়েই পালাতে চায়। শেষে কোন রকমে উঠে পড়লুম ডাস্টবিনের ওপরে কিন্তু স্কাইলাইট কষে আটকে আছে! একহাতে লোহার শিক ধরে ব্যালেন্স সামলাচ্ছি আরেক হাতে ঠেলছি জানলার নিচের দিকটা, সে কিছুতেই খোলে না। হাল্কা কিল মেরেও দেখলাম, তাতেও খোলে না! এদিকে বেশী জোরে ঘুঁষো মারা যাবে না, যদি কাঠের ফ্রেমে না লেগে কাঁচে লাগে, ভেঙে যাবে আর রক্তারক্তি হলে ধরা পড়ে গিয়ে টিসি খাবো।এই টিসিকে আমরা যমের মত ভয় পেতাম। টিসি অর্থাৎ ট্রান্সফার সার্টিফিকেট, মানে ইস্কুল-খেদানো! টিসির ভয়ে আমাদের সবচেয়ে সাহসী বা ডানপিটে ছেলেও কেঁচো হয়ে যেত... অতয়েব প্যালাকে নাড়ু চেপে ধরলেই আমার কেস জণ্ডিস! আমি ঠেলছি, হটাৎ প্যালারাম ছুট্টে অন্তর্দ্ধান করলেন। সেকি ভয়ঙ্কর ব্যাপার, লাফিয়ে নামতেও পারছি না এদিকে ভাবছি নিশ্চিত কোন টিচার বা কেউ এসেছেন তাই প্যালা পলায়ন করেছে আর আমি ত্রিশঙ্কু হয়ে শিক ধরে ঝুলছি! একেকটা মুহূর্ত যেন এক যুগ, এই বুঝি ধরা পড়ে গার্জেন কল হল! ঠকঠকানির শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে দেখি প্যালা আসছে স্ক্রাপার কাঁধে। আহাম্মকের বুদ্ধি দেখো, আমি মরছি ভয়ে আর সে দাঁত ক্যালাতে ক্যালাতে আসছে হেলেদুলে! যাই হোক, দুজনে মিলে স্ক্রাপারটাকে ধরলুম হাতুড়ির মত করে, আমি ওপরটা ঠিক করে বসালাম স্কাইলাইটের ফ্রেম বরাবর আর প্যালা নিচের ডাণ্ডাটা বাগাল। জয়েন্ট ভেঞ্চারের ঠোকাঠুকিতে স্কাইলাইট ফাঁক হলো অবশেষে। আমি হাত ঢুকিয়ে দিয়ে ওদিকের ছিটকিনি হাতড়ে খুলে ফেল্লাম অনেক কষ্টে, হাতের নুনছাল উঠিয়ে। দরজাটা ভেজিয়ে রেখেই আমরা ডাস্টবিন নিয়ে দে ছুট! বিকেল শেষে সবাই ফিরে এলো খেলার মাঠ থেকে, খুঁজে বারকরলুম কয়েকজনকে যারা আমার মতোই বেচোলাস্পিশিস এর ওপরে ক্ষেপে ছিল। সবাই গা-পায়ের কাদা ধুয়ে আমার পাগলা দাশুবৎ প্লানের শ্রাদ্ধ করে টিফিনের ঘন্টা পড়তেই ডাইনিং হলে খেতে গেল, শুধু আমার মুখেই মুড়ি-আলুর চপ রুচলো না! ডাইনিং হল থেকে ফিরে প্রেয়ার হলের জন্য ধুতি উত্তরীয় পরে, আমরা তিনজন ফন্দি ফাঁদতে বসলাম। যে পূর্বজ বলেছিলেন ‘অধিকন্তু ন দোষায়’ তিনি “মন্ত্রঃ গুপ্তি অধিকে গ্যাঁজায়” না বললেও আমরা জানতাম তাই কমান্ডো অপারেশন ঠিক হল। আমাদের সিদ্ধ কুঞ্জিকা স্তোত্র মন্ত্র না জানা থাকলেও, ছিল একটা আস্ত টিউব ডেনরাইট (ডেনরাইট ছিল আমাদের সময়ের ইন্সট্যান্ট এডহেসিভ, চট করে আটকে যাওয়ার আঠা) আর কিছু আদ্দামড়া বদবুদ্ধি! ঠিক হল, প্যালা গিয়ে সবার আগে প্রেয়ার হলে শেষের দিকে বসবে, যাতে লাইন ছাড়লেই আগে ভাগে এসে আমাকে জানাতে পারবে। শঙ্কর আমাদের ভিসি/ভাইস ক্যাপ্টেনকে ম্যানেজ করবে যাতে প্রেয়ার হলের গুনতি মিলে যায়, আমাকে ছাড়াই। আর আমি, প্রেয়ার হলের ঘন্টা পড়ার আগেই বাথরুমে গিয়ে লুকিয়েও থাকবো। ঘন্টা পড়লো, আমি তখন একতলার বাথরুমে দরজা বন্ধ করে মশার কামড় খেতে শুরু করেছি। আশানুরূপ সবাই দোতলার প্রেয়ার হলে চলে গেল। ‘খণ্ডন ভব’ শুনতে পেয়ে চুপিসাড়ে বেরিয়ে এলাম খুব সাবধানে কারণ আমারদের একতলার ব্লকের শেষের ঘরে বদেশদা থুড়ি, স্বদেশদা থাকতেন। উনি ছিলেন আমাদের ভবনের/হোস্টেল বিল্ডিং এর কেয়ারটেকার এবং নাড়ুর চামচা। বদেশদা কালে ভদ্রে প্রেয়ার হলে যেতেন তাই ধরা পড়ার ভয় ছিল। ডিডেকটিভ গল্পের চোরের মত, আমাদের চৌকোনা ছকের গাঢ় নীল বেডকভারে মাথা লুকিয়ে এলাম স্টাডিহল এর মাঝের ভেজানো দরজার সামনে। ঢুকতে যাবো হটাৎ মনে হলো কে যেন ডানদিকের নিচের দালানে এসেছে! আমি তো ভয়ে কাঠ... আড়চোখে তাকিয়ে দেখি, ওম্মমাঃ এযে বিল্লী! টুক করে ঢুকে পড়লাম, পুরো স্টাডি হল অন্ধকার, জানলা দিয়ে হাল্কা চাঁদের আলো পড়ছে। এগোতে গিয়েই বিকট ঠোক্কর খেলাম হাঁটুতে বেঞ্চির কোনায়, আওয়াজ থামাতে ব্যাথা ভুলে গেলাম। খানিক চুপ করে থেকে, চাদরের নিচে টর্চ জ্বালিয়ে পৌঁছে গেলুম স্যারদের বসার ডায়াস/চৌকীর কাছে। ডায়াসের ওপরে, শিক্ষকদের চেয়ারটা টেবিল এর নিচে থেকে একটু বার করে মনের সুখে ডেনরাইট ঢেলে মাখাতে শুরু করলাম। বসার জায়গাটা জবজবে করে ডেনরাইট লাগিয়ে, আস্তে আসতে ফিরে এলাম দরজার কাছে। কান পেতে শোনার চেষ্টা করছি যে প্রেয়ার হলে এখন কি হচ্ছে… কোন শব্দ নেই, তাহলে কি পাঠ ও হয়ে গ্যাছে, ধ্যান চলছে? তার মানে তো যে কোন সময়েই প্রার্থনা শেষ হয়ে সবাই বেরিয়ে আসবে! দরজা ঠেলে বেরোতে যাচ্ছি অমনি ক্যাঁচ করে আওয়াজ, আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হওয়ার জোগাড় বটে! ধীরে সামলে নিয়ে, বেরিয়েই ছুট... বাথরুমের ভেতরে সিঙ্গেল পায়খানার খোপে ঢুকে, তবে নিঃশাস ফেলা। সময় যেন কাটতে চায় না, কোথায় প্রার্থনা শেষ? ওদিকে আবার “মন রে কৃষি কাজ জানো না” শুরু হয়েছে আর এদিকে হতচ্ছাড়া মশার দল পোঁপোঁ করে আমার ধুতি ভেদ করে নাড়ুর ভাষায় ‘অস্হান-কুস্হান’ জ্বালিয়ে দিচ্ছে! কালরাত্রিও শেষ আছে কিন্তু নরেন্দ্রপুরের মশার কোন শেষ নেই, মনে হচ্ছ যেন আমাকে গালিভার বা অরণ্যদেবের মত আমাকে উড়িয়ে নেবে এই লিলিপুট ফৌজ।
অবশেষে সহপাঠীদের পায়ের শব্দ পেলাম আর স্বাভাবিক শোরগোল, বাথরুম থেকে রুমে ফিরে মনে হল এবারে আমার ম্যালেরিয়া ঠেকায় কে! অর্থাৎ বাড়ী যেতে পারবো। রুমমেট শ্যাম্পু জিজ্ঞেশ করলো, “প্রেয়ারহলে তোকে দেখলাম না তো, কোথায় ছিলি!” সম্পূরন ছিলো ভালো ছেলে, আমাদের মতলব জানলেই হয়েছে! “ঘুমোচ্ছিলাম, নাড়ু বার করে দিলো!” শুনে শ্যাম্পু মুচকি হেসে বললো, “তোকে শাস্তি দিয়ে কি হবে, বাইরে দাঁড়িয়ে তুই আর কয়াল তো ঘোড়ার মতো ঘুমোস!”… কথাটা সত্যি, নাড়ু আমাদের খেলা ধুলোর পরে ফ্যানের নিচে বসে একটু ঘুমুতেও দিতো না।
বই খাতা নিয়ে স্টাডি হলের দিকে যেতে যেতে চেক করে নিলাম যে ভুলে মলাট দেওয়া গল্পের বই নিয়েছি কিনা, আজ কোনো চান্স নেওয়া যাবে না। আমার বসার জায়গা মদ্দিখানের সারির পেছনের দিকে, ফ্যানের তলায়। ঘরে ফ্যান নেই তাই গরমের দিনে যে করে পারি আমরা চেষ্টা করতাম ক্লাসে, স্টাডিহলে, প্রেয়ারহলে আর ডাইনিংহলে ফ্যানের নিচে জায়গা করে নিতে। বসেই দেখি, সাথে এনেছি কে সি নাগের অংকের বই আর গুচ্ছের খাতা, গেল সন্ধেটা! টুক করে স্যারের চেয়ারটা দেখে নিলাম, বসার জায়গাটা বার্ণিশের মত চকচক করছে। সিধু মণ্ডলকে বার খাইয়ে দিলাম অঙ্ক নিয়ে, স্বপনকে উসকে দিলাম সাইন্টিফিক নামের লিস্ট বানাতে আর শ্যাম্পুকে লাগলাম ইংলিশ কম্পোজিশানে — যাতে বাসুদেবদা চেয়ারে বসলেই ছেঁকে ধরে আর উনি টহল দেবার জন্য ওঠার সুযোগ না পান। পড়ার ও একটা হুজুগ ছিলো, ওদের দেখে আরো অনেকে ছুটলো পড়া দেখিয়ে ইম্পু / ‘ইম্প্রেশন’ বাড়াতে। বৃষকাষ্ঠ বেষ্টিত ষাঁড়ের মত সকলে মিলে বেচোকে ঢুঁসিয়ে দিতে থাকলো নিজের নিজের পড়ার কোশ্চেনের তোড়ে। উনি নতুন টিচার, পরম উৎসাহে ছেলেদের বোঝাচ্ছেন, কোশ্চেন সমাধান করে দিচ্ছেন আর নীরবে সেঁটে যাচ্ছেন। প্রায় এক ঘন্টা হয়ে গেল, আমি ভাবছি কখন ভীড় ফর্সা হবে আর ওনার পশ্চাৎদেশে টান পড়বে! হটাৎ দরজার দিকে তাকিয়ে কাঠ হয়ে গেলাম ভয়ে... নাড়ু আসছে এদিকে।এতো দেখি, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সেখানেই কাছা খুলে যায়! নাড়ু এসে দরজায় দাঁড়িয়ে, আমরা যারা ফিশ ফিশিয়ে গল্প করছিলাম তারা চুপ মেরে গেছি, রবার ব্যান্ডের গুলতি লোকানো হয়ে গেছে, কিন্তু ইম্পু-শিকারীদের আর বেচোলার কোন হুঁশ নেই। নাড়ু মাথার ওপরে পাট করা গেরুয়া উত্তরীয়টা নামিয়ে কাঁধে ফেলে, মাথা চুলকোতে চুলকোতে গলা খাঁকরি দিলেন। প্রশ্নবানে জর্জড়িত বেচো, লা খুঁটি, হয়ে গেছেন ছেলেদের মধ্যে, কোন তাপ উত্তাপ নেই। অগত্যা নাড়ু আওয়াজ দিলেন, “মাস্টার মশাই … খক খক... এহেম!” বেচোর খেয়াল হলো, উনি মহারাজকে দেখে তড়বড় করে উঠতে গিয়েই, টান এবং ধুতি ফেড়ে যাওয়ার পড়পড় শব্দে বুঝতে পারলেন যে সেঁটে গেছেন! এখন না পারছেন উঠতে, না পারছেন ওয়ার্ডেনকে দেখেও বসে থাকতে, বিকট কেলো! উনি ছেলেদের ভাগিয়ে আমতা আমতা করে বললেন, “মহারাজ গুড ইভিনিং… মানে, …ছেলেরা, ইয়ে …প্রশ্ন এনেছে…” নাড়ু দেখলেন বেচো এখনো বসে, পুরো ফায়ার হয়ে ডাকলেন, “শাল ইউ কাম হিয়ার?” এদিকে বেচো হয়ে গেছে কেঁচো, নাড়ুর অগ্নিশর্মা রূপ দেখে উনি চেয়ারের দুটো হাতল ধরেই উঠে পড়লেন! নারায়ণদা হাঁ হাঁ করে উঠলেন, “ইকি, ইকি করেন! চেয়ার নিয়ে উঠছেন কেন?” লজ্জিত বেচোর মুখ দিয়ে কথা ফুটছে না, ফর্সা মানুষ লাল হয়ে উঠেছেন। নাড়ুর চৈতন্য হলো, বুঝলেন কিছু একটা হয়েছে, চেল্লানী শুরু হল, “বদেশ, বদেশ! কিঞ্চিত ইদিকে এসো বদেশ!” এরপরের জাজ্বল্যমান দৃশ্যগুলো কিছুটা অনুমান করা যায়, নাড়ু সব্বাইকে শাসালেন …শেষে স্টাডি হল ডিসমিস করে আমাদের সকলকে ঘরে পাঠিয়ে দিলেন। আমাদের কামরাটা একতলার ব্লকের প্রথম। আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে স্টাডিহলের জানলা দিয়ে টিচারদের চেয়ার টেবিল দেখা যেত। আমরা বেশ অনেকে আমাদের ঘর অন্ধকার করে ওঁৎ পেতে বসে রইলুম। শেষে দেখি স্বদেশদা এসে বেচো লা স্পিশিসকে একটা গামছা গছিয়ে, স্টাডিহলের আলো নিভিয়ে দিলেন। অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেলাম না; একটা চেয়ার পড়ার শব্দ, একটা চাপা আর্তনাদ, কিছু কাতরানি আর হুড়মুড় করে পড়ার শব্দ। তারপর স্টাডিহলের দরজা বন্ধ করার শব্দ হতেই আমরা বেরিয়ে এলাম ব্লকের সামনে।দেখি স্বদেশদা দরজায় তালা লাগাচ্ছেন আর বেচো লা স্পিশিস গামছা দিয়ে কোন গতিকে লজ্জা সংবরণ এর প্রচেষ্টায় জড়োসড়ো, এতোকটা ছেলে দেখে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় পালাতেও পারছেন না!
সেদিন আমি পাগলা দাশুর মতো মিচকি হেসেছিলাম না হোহো করে প্রতিশোধ নিয়েছিলাম মনে নেই। তবে, আমার পাগলামোর নিদর্শনে ‘বেচো লা’ নিশ্চিত আমাকে হোমোসেপিয়ান ছাড়া অন্য কোনো শাখামৃগী স্পিশিস ভেবেছিলেন!
ক্রমশ প্রকাশ্য: ২. কেমিকেল লোচা
#highlights
————•———
📖
|| ইতিহাসে পাতিহাঁস ||
https://www.facebook.com/share/eFqUUYeo57MZtgMY/
|| ভূগোলেতে গোল...||
https://www.facebook.com/621382335/posts/10158144271677336/
|| অঙ্কেতে মাথা নেই…||
https://www.facebook.com/share/p/cb4UBM43cFR2WGw5/
|| হয়েছি পাগল …|| https://www.facebook.com/share/RTDjQ1WhuMiryRJk/