This is just the starting of a WIP novel.
- । ১. ভোলা ।
শ্যামবাবু সবে বেরিয়েছেন গড়িয়াহাটের দুনম্বর গেট দিয়ে অমনি দেখেন মুনিয়া এসে তাকে ঘিরে নাচন কোঁদন শুরু করেছে। মুনিয়া পাখির মতনই তার স্বভাব, পিটিং পিটিং করে নেচে বেড়ায়। এই যে এত্তক্ষন রেগেছিলেন শ্যামবাবু, নিমেশে জল... ছোট্ট মুনিয়ার আবদারে। সে মুখে কিচ্ছুটি বলে না, শুধু হাতের পাতাটা উন্মিলিত করে, নাচের স্কুলের শেখা ভঙ্গিমায় ঘূর্ণীর মত প্রদক্ষিণ করে চলে তার কৃষ্ণদাদুকে। মাঝে মাঝে দুস্টুমি করে নাচ শেষ হবার পরেও চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন মুনিয়ার কচি হাতটা চলে যায় তাঁর পকেটে। আজকে শ্যামবাবু বাস্তব থেকে হারিয়ে গেছিলেন আগের ঘটনার আর একরত্তি মুনিয়ার নাচনে। নাচের শেষে মুনিয়া পকেট তোলপাড় করে খালি হাতটি তার সামনে এনে অভিমানী চোখে তাকালো! “যাঃ, বড্ডো ভুল হয়ে গেছে তো মুনিয়া রানী!” বলে ওকে কোলে তুলে টফির দোকানের দিকে ফিরেই দেখেন মিসেস সমাদ্দার ব্যাস্ত সমস্ত ভাবে এসে পড়েছেন। “মেসোমশাই, আজ আর ওকে টফি দেবেন না, ক্রিমিতে দাঁত কিড়মিড় করেছে কাল রাতে।” শুনেই এক ফোঁটা গড়িয়ে পড়লো মুক্তধারা। কারোর সবচেয়ে আপন দাবীর জায়গায় যদি অন্য কেউ বাদ সাধে, সেটা কি ভালো লাগে? হোক না মা, এখন যদি দাদুন থাকতো, মাম্মা কি বকা খেত না? মুনিয়া কৃষ্ণদাদুকে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি আমার দাদুন না কেন? দাদুন হলে ঠিক মামকে বকে দিতে পারতে।”
এইটুকু পুঁচকি মুনিয়া, সেও বুঝে গেছে যে তার কৃষ্ণদাদু কাউকে বকতে পারে না!
শ্যামবাবু আর কি করেন, অপারক হয়ে মিসেস সমাদ্দারকে বলেন, “আপনি একবার মিস্টার সমাদ্দারকে বিকেলে পাঠাবেন, আমি একটা চিরতার আরক করে রাখবো, সকালে খালি পেটে, নাক টিপে খাইয়ে দেবেন। দুদিনেই সব সাফ হয়ে যাবে।” এদিকে মুনিয়া আহত চোখে তাকিয়ে তার পাজামার পেছনে লুকিয়ে পড়েছে, তার এই বিশ্বাসের জায়গা থেকে অপ্রত্যাশিত আঘাত সহ্য করতে। শ্যামবাবু বোঝান, “আরে মুনিয়া রানী, তুমি ভয় পেয়ো না, নাক বন্ধ করে খেলে চিরতা তেতো লাগে না মা।”
মিসেস সমাদ্দার ভীষণ ব্যস্ত, মেয়ের হাতটা ধরে, আলগোছে, “আসি মেসোমশাই!” ছুঁড়ে দিয়েই রাস্তার ওদিকে ছুটলেন। পড়ে রইলো দুটো জোড়া চোখ, গড়িয়াহাটের লোকের মেলার মাঝে একটানা দেখে চললো একে অপরের দিয়ে … হারিয়ে যাবার পরেও।
বয়েসের ধর্ম এই যে, সে ‘ধৈর্য’ ও ‘সহ্য’ করতে শেখায় — কিন্তু ব্যাথা পাবার আগে এই গুনগুলোর কথা মনে পড়ে না আজকাল। মুনিয়ার ব্যথা আজ শ্যামবাবুর কিছু আগের ঘটে যাওয়া মাছের বাজারের বিরক্তিকর ঘটনাটির ক্লেদ খানিকটা মুছে ফেললো।পেনশনের টাকাটা এখনো জমা হয়নি। পুরোনো মাছওলা নবাবের ছেলে রনি যখন সবার সামনে খোঁটা দিয়ে বললো, “জেঠু, বোয়ালটা ঘাঁটবেন না, আইসটা শোরে গেলে দাগতার বাবু ফ্রেশ না বলে লাটোক করবেন। আর আপনি তো সব ঘেঁটে সেটে, ভোলাই লেবেন!” — তখন যে কোথায় এই গুনগুলোর সরে পড়লো কে জানে!
পকেট পয়সায় গরম নয় কিন্তু এতবছরের অভ্যেস বসত, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি বড়োবাবু বলে ফেললেন, “বেশি বাজে বকিস না রনি, তুই দুদিনের ছোঁড়া। এখনো ওপরে ফোন করলে তোর লাইসেন্স কেড়ে নিয়ে যাবে!” রনিও আজকের ছেলে, ঠোঁট উল্টে বললো, “যা ভাক বুড়ো, চল্লিশ মিনিট বকে কিনবি তো ভোলা… আবার এসেচে বাওয়াল দিতে! যাকে ইচ্ছে ফোন কর শালা! আমিও দিদির ক্যাডার, বোতল (অমুকে) গুঁজে দোবো!” ইত্যাদি নোংরা গালাগাল। দোষটা শ্যামবাবুরই, একে ট্যাঁক গড়ের মাঠ, তারপর ঠুনকো সন্মানজ্ঞান, কি আর করবেন, কেটে পড়লেন লোক হাসিয়ে। ব্যাপারটা মনে পড়তেই জিভটা চিরতার মত তেতো হয়ে গেল। ঠিক যেমন মুনিয়ার লাগবে কাল সক্কালবেলা! কি আর করা, এক আঁটি চিরতার জন্যে পিছু ফিরলেন।
মধুপর্ণা ওরফে মুনিয়ার আজ মন ভালো নেই, সকালে কৃষ্ণদাদুর কাছ থেকে টফিটা মাম্মা আটকে দিল। এদিকে পুন্নিপিসি বাজে ছানা আর ফ্রুট স্যালাড দিয়েছে টিফিনে! বাবা অফিসের কাকুদের বকেই চলেছে ফোনে, ওখানেও কিছু বলা যাবে না, ঠিক স্কুলের সামনে, “হোল্ড প্লিজ!” বলে হামি দিয়ে নামিয়ে দেবে!
কৃষ্ণদাদু কালকে আবার মধুসূদনদাদার গল্প বলেছিলো, শেষে বলেছিলো, “মুনিয়া রানী, মনে দুঃখ পেলে, আর কাউকে বলতে না পারলে মধুসূদনদাদাকে বোলো, সে সব ঠিক করে দেবে।” কৃষ্ণদাদু কিচ্ছু জানে না, মুনিয়া যেই মধুসূদনদাদার ফোন নাম্বার চাইলো, দাদু অমনি বানিয়ে বানিয়ে বলে দিলো, “তুমি মনে মনে তাকে বলো মা, সে ঠিক শুনতে পাবে।” মুনিয়া কৃষ্ণদাদুকে কত্ত বোঝালো, যদি মধুসূদনদাদা ঘুমিয়ে পড়ে কিংবা যদি ডোরা কার্টুন দেখার সময়ের মতন ল্যাগ হয় — তাহলে কি হবে? দাদুটা কিচ্ছু জানে না, ভিডিও কলই করতে পারে না! কি আর হবে, ভীষণ কান্না আসছিলো তাই মনে মনেই মধুসূদনদাদাকে কমপ্লেন করলো মুনিয়া। গাড়ির কাঁচের বাইরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়লো, মধুসূদনদাদাও কি মুনিয়ার মত দুঃখ পেয়েছে? দাদু বলে মধুদাদার কান্না পেলে, বৃষ্টি আসে — সত্যি? তবে বৃষ্টি মুনিয়ার খুবই পছন্দের জিনিস, ছপ ছপ করে জলে লাফানো যায় কিন্তু পুন্নিপিসি একদম রাস্তায় হাত ছাড়ে না! বেশি বৃষ্টি পড়লে স্কুলে রেইনিডের ছুটি থাকে, সেদিন খুব মজার… মাম্মা পুন্নিপিসিকে খিচুড়ি বানাতে বলে, যদিও সাথে ব্রকোলিও খেতে হয়। তবে কৃষ্ণদাদুর বাড়ীতে সারাদিন গল্প আর বেগুনি-ফুলুরী মুড়ি। এখন পাসের ফ্ল্যাটের রোহন ভাইয়াও যায় মুনিয়ার সাথে দাদুর বাড়ীতে। আজ কি জোর বৃষ্টি পড়বে? রোহন ভাইয়া বলেছিলো ওর দাদা বলে ভগবান যখন হিসু করে, তখনই নাকি বৃষ্টি পড়ে। ঠিক যেমন ওরা যেমন দাদুর বারান্দার কোনে করেছিল আর পাইপ দিয়ে পড়েছিল — মাম্মা জানতে পেরে কি পিট্টি দিয়েছিলো! ধুস তাই হয় নাকি, বৃষ্টিতো অমনি ডার্টি না!
বাবাই ফোন রেখেছে, স্কুল তো এখনো আসেনি। মুনিয়া ট্রাই করলো, “বাবি, আজ রেইনিডে?” বাবা মুখ ফিরিয়ে হেসে বললো, “Why my love, আজ স্কুল যেতে ইচ্ছে করছে না?” বাবাই কেমনি করে যেন মুনিয়ার মনের কথা জানতে পেরে যায়। বাবাই মুনিয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড, তাই মুনিয়া বলে, “আজ মন খারাপ মধুদাদার আর আমার, রেনি ডে হলে দাদুর বাড়ী যাবো।” বাবা বললো, “মধুদাদা কে, মাম্মা?” মুনিয়া তখন দাদুর মতো করে ভালো করে বললো সেই গল্পটা যাতে বনে ভয় পেয়ে ডাকলেই মধুদাদা চলে আসতো আর পরে দইয়ের ভাঁড় দিয়েছিলো। মাঝে বাবাই এর ফোন বেজে ছিল, তাও কেটে দিয়ে মুনিয়ার পুরো গল্পটা শুনে বলল, “Finished, মাম্মা?”
“না, দাদুন বলেছে আরো অন্য গল্প আছে মধুদাদার।”, মনে পড়ে জিভ কেটে মধুপর্ণা বলল, “সরি ‘দাদুন’ না, কৃষ্ণদাদু!”
বাবাই গাড়ী থামিয়ে মুনিয়াকে ব্যাক সিট থেকে সিটবেল্ট খুলে কোলে নিয়ে বললো, “মাম্মা তুমি দাদুনকে মিস কর? আমিও ভীষন মিস করি!” বাবাইও মধুদাদার মত বৃষ্টি ফেলে বললো, “এবার থেকে তুমি কৃষ্ণদাদুকে ‘দাদুন’ বলতে পারো মাম্মা! আমি মামকে বলে দেব, তোমাকে বকবে না। তবে দাদুনকে এক্কেবারে ভুলে যেও না সোনা।” তারপর বাবাই অফিসের কাকুদের ফোন করলো, মামকে ফোন করে বুঝিয়ে, মুনিয়াকে বললো, “মাম্মা চল আমরা তোমার নতুন দাদুনের বাড়ী যাই!”