Saturday, January 5, 2019

|| বিস সাল বাদ …||

ক্যাবলা আর ভীরু, অনেক সময়ই একাধারে বর্তমান থাকে ... কিছু সময়ে ব্যতিক্রম! ঘটনা চক্রে, আমি তার  যাওয়া ট্রামটাতে উঠতে না পারলেও, ঘোর কাটিয়ে একটা অটোর সামনেই সিটে বসেছিলাম | বলা বাহুল্য, ট্রামের থেকে অটো ছোটে তাড়াতাড়ি আর তক্ষুনি বলতে হয় না কোথায় নামবো l চোখদুটো ট্রামের দিকে সেঁটে এক অচেনা উত্তেজনার মধ্যে চলেছি - সে যদি আগে নামে, পিছু করবো? যতই বখাটে হই, মন মানতে চায় না যে, আমি পাড়ার সেই পিছে-পিছে চলা, সিটি-মারা-দাদাদের মতো লোফার, তাই অন্তদ্বন্দ হয়!


মনে হয় সে পেছন ফিরে আমার দিকে তাকালেই, আরেকটু নিচু হয়ে যাবো | নাহঃ, সাহস করে কিছু বলতেই হবে কারণ সিডনি শেলডন বা মিলস এন্ড বুনসের নায়করা কোনোদিন চুপ থাকেনি ... cool ব্যাপারটা তখন চালু হয়নি আমার জীবনে | এই সব ভাবতে ভাবতেই দেশপ্রিয় পার্ক এসে গ্যাছে, ট্রাম দাঁড়িয়েছে ... কোনোরকমে অটোওলাকে ভাড়াটা গছিয়ে ছুটলাম ট্রামলাইনের দিকে | বুকের হাতুড়িটা কানে তালা লাগিয়ে দেবে... যদি ট্রাম ছেড়ে দেয়! একটা সবুজ আলো জ্যামে দাঁড়ানো অনেকের স্বস্তির কারণ হলেও, আমার জীবনের দীর্ঘশ্বাস হবেই | আমি ভীতুই বটে, সেকেন্ড ক্লাসের গেটের হাতলটা ধরে ঝুলে পড়লাম, সে আছে সামনের কম্পার্টমেন্টে! এতো লোকের মধ্যে এখনো তাকে দেখতে পাইনি, নামেনি আমি নিশ্চিত ... একটা পরিচিত অনুভূতি টের পেলাম, পরীক্ষার ফল বেরোনোর আগের শুকানো গলা | একবার দেখতে পেলেই নিশ্চিন্ত, এতো শিকারির শিকার দেখতে পাওয়া না; অনেকটা ‘deer caught in headlights’ এর মতো, সে জানে যে মানুষের রাস্তা পার হচ্ছে কিন্তু চোখে জোরালো আলো পড়াতে ধাঁদিয়ে গেছে!

সত্যি নেমে গেছে কি? বুঝতে পারছি না, ঢুকে ওপরে উঠে কানেকটিং জানলা দিয়ে ঝুঁকি মারবো না ট্রাম আস্তে হলেই দৌড়ে গিয়ে ফার্স্ট ক্লাসে উঠবো| গিয়ে কি বলবো - sorry? তোমাকে ভীষণ ভালো লাগে? তোমাকে এই সব বলা উচিত হয়নি? সবকটাই ভীষণ ক্যাবলা ক্যাবলা লাগছিলো |  সেদিন দেখা হয়নি… হটাৎ কুয়াশায় হারিয়ে ফেললাম সেই স্মৃতির চলচিত্র। 


আরেকটা দৃশ্য ফুটে উঠলো, মনে পড়লো — একলা বসে আছি ওয়াশিংটন স্কোয়ার পার্কের বেঞ্চ, রাত একটা দুটো হবে, মুখে বমি করার পর সেই ক্ষার টকটক ভাব … মুড তিরিক্ষী - মন খারাপ। 

তখন নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে কমিউনিকেশন আর নিউ ইয়র্ক ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে গ্রাফিক ডিসাইন পড়ছি। নিজের একটা ব্যবসা আর দুটো পার্ট টাইম কাজ করি। মদ খেয়ে বন্ধুদের সাথে হুল্লোড় করার সময় নেই, কাজ আর কাজ! সেদিন রাতে আমার স্রিপ্রস এর বন্ধুদের সাথে অনেকদিন পর দেখা হয়েছিল। ওরা দুই পিসতুতো ভাই, পেত্রোস আর নিওট্রোস, আমার হয়ে বারে মারপিট করে … রক্তাক্ত হয়ে একসাথে আকণ্ঠ জ্বিবানা খেয়েছিলাম। স্রিপ্রস এর প্রচন্ড তীব্র জ্বিবানাও আমার মনকে শান্ত করতে পারেনি!   এন. ওটাই. ইউ. এর পাশেই হাডসন স্ট্রিটের “দান্তে”তে আমার একস আর সেই ট্রাস্ট ফান্ড ছোঁড়াটাকে দেখে মটকা গরম হয়ে গেছিলো। পেটের পানি সংগ্রামী করে তুলেছিলো মধ্যবিত্ত মানসিকতাকে, বড়োলোকের ছেলের টাকার কাছে হেরে গিয়ে পৌরুষ জেগে উঠেছিল! ঝেড়ে দিয়েছিলাম গোটা কয়েক আপার কাট! তখন রক্ত গরম, সমাজ শুধরে বেড়াচ্ছি, ধারণা সবাই এক আইনের চোখে। মুখের ঝাল মেটানো আর খানদানি সাদা ছেলের গায়ে হাত দেওয়া এক নয়! প্রথমে, নবাবপুত্তুরের পোষারা মাথার পেছনে বোতল ভেঙে যখন এলোপাথাড়ি পেঁদাচ্ছে, তখন চিনতে পেরে পেত্রোস আর নিওট্রোসই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আমাকে বাঁচাতে। পেটানো শরীর, মনে ভীষণ হীনমন্যতা অন্য সাদাদের থেকে, ওদের দুজনকে অসুরের মত শক্তি দিয়েছিলো। যখন ভাড়াটে পেটোয়ার দল পালালো, তখন টাকা ছড়িয়ে পুলিশ লেলিয়ে দিলো বড়োলোকের ব্যাটা! আমরা দৌড়ে অন্ধকার ওয়াশিংটন স্কোয়ার পার্কের মধ্যে পীঠটান দিলাম। ধরা পড়লেই সোজা চালান করে দেবে আর পুলিশ কেস হলে, ভালো রেজাল্ট সত্ত্বেও আমার ডিনস স্কলারশিপ খারিজ হয়ে যাবে… কলেজে পড়া লাটে উঠে যাবে! এই সব ভাবতে ভাবতে, হাঁফাতে হাঁফাতে পৌঁছলাম নিওট্রোস এর ভাড়া করা এঁদো বেসমেন্টে। তার পর যা হয়ে থাকে, নবাবপুত্তুরকে গাল পাড়তে পাড়তে ওদের দিশি মদ শেষ করা! 

খালি পেটে লাগামহীন বারীসেবনের ফল দেশে-বিদেশে একই … পেট মোচড় দিয়ে মুখ দিয়ে কি বেরোয় তা যার হয় সে অনুধাবন না করতে পারলেও পারিপার্শিক লোকে নাক কুঁচকে এড়িয়ে যায়। কখন ওদের বেসমেন্ট থেকে বেরিয়েছিলাম জানি না। ঘোলা চোখে, একা পার্কের বেঞ্চে বসে জমা ঘাম বরফ শীতল করে দিচ্ছিলো শরীরটা, ভাবছিলাম কি দরকার চাঁদের দিকে হাত বাড়াবার! 

এমন সময়ে মুখের ওপরে একটা ছায়া পড়লো। নেপথ্যে চাঁদ, সামনে মসীবর্ণ ছায়া পরিলেখ, চেনা-অচেনা এক গলা! “তুমি, ললিপপ?! সরি, আই মিন চিরন্তন।”
বিধির কি বিধান, যারে “ধরি ধরি মনে করি” … সেই দেখে আমাকে নিজের শেষ ধাপে ধরাসায়ী!

। নেপথ্যে চাঁদ,  সামনে মসীবর্ণ ছায়া পরিলেখ, চেনা অচেনা এক গলা! “তুমি, ললিপপ?! সরি, আই মিন চিরন্তন।”
বিধির কি বিধান, যারে ধরি ধরি মনে করি … সেই দেখে আমাকে নিজের শেষ ধাপে ধরাসায়ী! 
গলাটা কি চেনা? বাংলায় বলছে নাকি আমার মদ্যপ মাথার কারসাজি? “ললিপপ”… কে যেন, কবে বলেছিলো সুদীর্ঘ অতীতে? 
মুখ থেকে কি বেরোলো দেবাঃ ন জানন্তি! “মাই ব্যাড। আই আমি এয়াম।” ধরণের কিছু বলে থাকবো। তাকে চিনতেও পারিনি। পরের দিন দেখলাম, আমি একটা সোফার ওপরের কেদরে পড়ে আছি। সামনের চেয়ারে বসে, টেবিলে অ্যাপলের রঙীন G4এ কাজ করছে একটি মেয়ে, আমার দিকে পেছন ফেরা। 

… to be continued 

No comments:

Post a Comment

💀ভূত চতুর্দশী ও বাঙালী আচার বিচার 👻

  ভূত চতুর্দশী হচ্ছে বাংলার একটি প্রাচীন আদিবাংলা হিন্দু উৎসব, যা মূলত কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে (অমাবস্যার ঠিক আগে) পালিত হ...