আপনাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, ইস্কুলে পড়ার সময়, সব থেকে খারাপ কি লাগতো? অনেকের হয়তো পরীক্ষা বা শাস্তির কথা মনে পড়বে ... আমরা যারা নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে বা বোর্ডিঙে পড়েছি, তাদের মনে পড়বে - rising bell এর কথা| বিশ্বাস করুন, এর থেকে খারাপ, নিমপাতার রস বা চিরতার জলও লাগতো না! শীতের সকালে নরেন্দ্রপুর এক ভয়ঙ্কর জায়গা ছিল আমাদের জন্যে, এই রাইজিং বেল মানেই শেষ লেপের বিলাসিতা, মুখ ধোবার নামে শুরু হিমশীতল জলের ছ্যাঁকা! বাড়ির বন্ধুরা (মানে যার যেখানে বাড়ি, সেই এলাকার বন্ধুরা) তখন ঘুমিয়ে কাদা, আর আমরা? ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আমাদের বিছনা-মশারি তুলে, ছুটতে হতো পি.টি. (ফিজিক্যাল ট্রেনিং) করতে!
একটু বেশি ঘুমোবে বা লেপের নিচে থাকবে বলে, লেটিস (যে অতীশ চিরকালই লেট) শুরু করলো সেই পিটির জামা-প্যান্ট আর মোজা পরে রাত্রে শোবার চল! পিটির আগে আমাদের ছিল হট ড্রিঙ্কস, তাতে যে কি থাকতো দেবাঃ না জাননংতিঃ! হরলিক্স, চা, ড্রিংকিং চকোলেটে, কমপ্লান, দুধ, জল, আদা - কিসের কি পরিমান মিশ্রণ বা ঋতুচক্রে উপাদানের ক্রমঃবিবর্তন - তা আমাদের কিশলয় মস্তিষ্কের কল্পনার বাইরে ছিল! এটা জানতাম, শীতের ভোর ছটার সময়ে উপাদেহ... গরমকালে বমন উদ্দ্রোদক, এক আরক যার সাথে দুটো বিস্কুট পাওয়া যেত| এহেন বস্তু, আমার মতো শয্যাবিলাসীর আকাশ কুসুম স্বপ্নের সোনার হরিণ, কখনো পাওয়া যেত রুমমেট নামক ভাইদের কল্যাণে! নিছক
করুণা না ভিক্ষা নয়, রীতিমতো যুক্তিসম্মত রফাদফার ফলে! আমার স্টিলের নাম-লেখা-গ্লাস যে নিয়ে যাবে নিচে ডাইনিং হলে, সেই পাবে বিস্কুট অথবা আদ্দেক হট ড্রিঙ্কের ভাগ! তাও অনেক সময়, এই ভাইটি লোভ জয় করে বলতো, "ধুর মাল (বা.. টা তখনও শিখিনি) নিজে উঠে নিয়ে নে!" ব্যাস হয়ে গেলো কেলো! মনে মনে আত্মগঞ্জনামুখর হয়ে উঠতাম ... না হয়, দুটো বিস্কুটই সাবাড় করতো, আদ্দেক হট ড্রিঙ্কসটা অফার করলে sure ব্যাটা আজো যেত!
পিটি এক অসহ্যকর জিনিস কিন্তু স্বামীজী বলে গেছিলেন যে মন তৈরী করতে গেলে দেহকেও গঠন করতে হয়! বিশ্বাস করুন, আমরা স্বামীজীকে ভালোবাসতাম কিন্তু শীতের ভোরে লেপ ছাড়ার ত্যাগ স্বীকার, চরিত্র গঠনের আদৌ উদ্দম জাগাতো না! কিন্তু স্বামীজীর সেই ডাক শুনেছিলেন আমাদের জুনিয়ার সেক্শনের - দেবুদা (ব্রতচারী + বাংলা), পঞ্চাননদা (স্কাউট + অঙ্ক); সিনিয়র সেক্শনের - সন্তোষদা (অঙ্ক), সারোদদা (NCC নেভি + ওয়ার্ক এডুকেশন + অ্যালুমনি) এবং অরুণদা (অঙ্ক + কোচ)! ওই ভোরে আমাদের আগেই পৌঁছে যেতেন প্রায়ই! ব্যায়াম করাতেন, ছুটতেন আমাদেরই সাথে আর দেরি করলেই প্যাঁদাতেন! এটা ক্লাসরুমের হালকা ফুলকা প্যাঁদানো নয়, উদ্দম সহকারে ক্যালানো ... ব্যায়াম করলে, সকলেরই ঘাম ঝরে, বিরক্তি লাগে ... তার ওপরে, যেই নরাধমগুলোকে উদ্ধার করতে এসেছেন সেগুলো যদি কপির মতো বাঁদরামি কিংবা খচ্চরের মতো একগুঁয়েপোনা করে, তখন কি আর মেজাজ ঠিক থাকে? ভেবে দেখতে হবে, হয়তো বৌদিরা এই ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়ানোর ব্যাপারটাকে ভালো চোখে দেখতেন না... বাড়ি ফিরে নিশ্চই চায়ের ব্যাপারটা ম্যানেজ করতে বেগ পেতে হতো, বাজারেও দেরি হতো! কিন্তু আমরা, অর্থাৎ ছাত্ররা, এই ত্যাগের কোনো মূল্যই দিতাম না| যে কোনো ফিকিরেই পিটি ফাঁকি দিতে পারাটাই বাহাদুরি ছিল, অতয়েব বোঝাই যায় পিটির ক্যাল এর মধ্যে কোনো খাদ থাকতো না!
এহেন পিটির সাথে যে পিঠ আর গালের এক নিবিড় সম্পর্ক আছে তা আমি ক্লাস ফাইবেই বুঝে গেছিলাম| বোধোদয় হবার সাথেই উপলব্ধি করেছিলাম আমাকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র ডাক্তার! কিন্তু ডাক্তারকে বোকা বানানো চাট্টিখানি কথা নয়, তবে ভাগ্য সহায় ছিল| ইস্কুলে ঢোকার আগেই আমার একটা তেলের ট্যাঙ্কার এর সাথে এক্সিডেন্ট হয়, ঠ্যাং যায় ভেঙে এবং tissue thrombosis (tissue গুলো মরে কালো হয়ে যায়) হয়| ডাক্তার বললো সাধারন কেডস পরা যাবে না, বাবা বিদেশ থেকে অনেক ব্যয়সাপেক্ষ স্নিকার্স আনিয়ে দিলো| ইস্কুলের নিয়ম, সবাই এক জামা জুতো পরবে - সব ছাত্রই সমান, ব্যাস দেবুদা এই স্নিকার্স না করে দিলেন! আমার তো পোয়াবারো! যতদিন বাবা আর স্কুল কর্তৃপক্ষের চিঠি চালাচালি চললো আমাকে পিটি থেকে সাসপেন্ড করা হলো! বন্ধুরা সকালে উঠে আমার ওপরে রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে চলে যেত আর আমি আয়েশে লেপের তলায় সুখনিদ্রায় স্বপ্নালোকে বিচরণ করছি! এখন বুঝি, রুমমেটগুলোর কি কষ্টই না হতো দিনের পর দিন আমার এই চালবাজি দেখে! যাই হোক, এতো লোকের অভিশাপ তো ব্যর্থ যায় না ... কপালে এ সুখ সহ্য হলো না বেশি দিন, মহারাজেরা অবশেষে ডাক্তারের কথা শুনে আমাকে পাঠালেন স্নিকার পরে পিটি করতে! দেবুদার মনে হয়তো হলো এ বড়োলোকের চালবাজি, তাঁর আদর্শের সাথে খেলা করছে| এদিকে আমার গেরো, একে বড়োলোকের ছেলে নই, আবার চাল না মারলে দেবুদার আদর্শের প্রকোপে প্রাণ ওষ্ঠাগত! শেষমেশ ঠিক করলাম নিজেই নিজেকে উদ্ধার করতে হবে| একদিন পিটির আগে বাথরুমে বসে কালো স্কেচপেন ভালো করে ঘষে দিলাম সারা উরুতে আকসিডেন্টের পায়ের, এর পর সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেললাম আলগা রংগুলো| এবার পাখানা দেখাচ্ছে কালচে বেগুনি, হাঁটুর একটু ওপর অব্দি, খাকি পিটির প্যান্ট খানা নিচু করে নিয়ে চললাম পিটির লাইন এ দাঁড়াতে| ব্যায়াম করলাম, যথারীতি ভুলের জন্যে দেবুদার চাঁটা খেলাম, এর পর যেই না ছুটতে পাঠিয়েছেন ইচ্ছে করে ধপাস করে পড়ে গিয়ে কাতরাতে থাকলাম! বলির পাঁঠাও মনে হয় আমাকে দেখে লজ্জা পেয়ে যেত! দেবুদা এসে ক্যাল দিতে যাচ্ছিলেন কিন্তু চোখে পড়লো আমার কালচে পাটা, পুরো ঘাবড়ে গেলেন আর সেকি অনুশোচনা! মাটির মানুষ ছিলেন, পঞ্চবটিতে বাঁদরদের কলা খাওয়াতেন, জানতেন না ওদেরই এক একটা ওনার ছাত্র! খুব গোলমাল করে আমাকে রিক্সা করে জুনিয়ার থেকে সিনিয়র সেকশন এর হাসপাতাল এ পাঠানো হলো| ভাগ্গিস কালো রংগুলো লোককূপের ভেতরে সেঁদিয়ে গেছিলো তাই দুদিন ধোয়ার পরও অল্প ছিল!
আমাদের প্রৌঢ় ডাক্তার মিত্র পা ধরতে গেলেই ডাক
ছেড়ে কাঁদতে থাকতাম, তিনিও ঠিক বাগে পেতেন না| এদিকে তেলের ট্যাংকারের সাথে আকসিডেন্টের কথাও বলতাম ... যাতে xray না করেন| শেষে দুদিন পর বাড়ির ডাক্তারের কাছে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলো| আমি জানতাম ডাক্তার জেঠুর কাছে জারিজুরি খাটবে না, একলা সব সত্যি কথা বললাম! সব শুনে জেঠু হেসেই খুন, বললেন আর এরকম করিস না, এখনকার মতো সামলে দিচ্ছি! বাবা-মা কে কি বললেন জানি না কিন্তু আমি দিন সাতেক বাড়িতে মজা করে কাটিয়ে ইস্কুলে ফিরলাম| তার পর থেকে দেবুদা আমাকে বিশেষ ঘাঁটাতেন না আর আমিও প্রায়ই পায়ে ব্যথা বলে পিটি কামাই করতাম ... সেই ক্লাস নাইন অব্দি!
তখনও কফিহাউস শুনিনি কিন্তু মনে মনে হয়তো বলতাম - কতজন এল গেলো, কতজনই আসবে ... কিন্তু পিটি তুমি আমারে করো ক্ষমা হায়!
- চিরন্তন
No comments:
Post a Comment